ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে দেশটির রাজধানী দিল্লিতে সক্রিয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) সাম্প্রতিক আন্দোলনের জবাবে এবার তীব্র পালটা অবস্থান গ্রহণ করেছে ‘লাল হিট জনতা পার্টি’ নামের নতুন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী। আন্দোলনের নামে মূলধারার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা তৈরি করা হচ্ছে দাবি করে সিজেপির নেতাদের তীব্র কটাক্ষ করেছেন নবগঠিত এই গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা।
নতুন এই গোষ্ঠীর উদ্যোক্তারা অভিযোগ তুলেছেন যে, দিল্লিতে অনবরত অহেতুক বিশৃঙ্খলা ও আন্দোলনের কারণে স্থানীয় সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামছে। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, এই ধরনের অনভিপ্রেত আন্দোলন শক্ত হাতে রুখে দিতে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি রাজপথে নেমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
গত রোববার (১৮ অক্টোবর) দিল্লির ঐতিহ্যবাহী মালব্য স্মৃতি ভবনে নিজেদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সদস্য সমাবেশের আয়োজন করে ‘লাল হিট জনতা পার্টি’। সম্প্রতি দিল্লির ব্যস্ততম কনট প্লেসসহ বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় সিজেপির নেওয়া লাগাতার কর্মসূচির জবাবে গড়ে ওঠা এই বিশেষ সমাবেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা জ্ঞাপন করা হয়।
আয়োজিত সমাবেশে গোষ্ঠীটির মূল উদ্যোক্তা অয়ন ভাটনগরসহ অন্যান্য বিশিষ্ট বক্তারা সিজেপি, কংগ্রেস এবং চলমান আন্দোলনকারীদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তাঁদের সুর চড়িয়ে অভিযোগ করা হয় যে, এসব অনর্থক বিক্ষোভ আন্দোলন স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ব্যবসায়ী সমাজকে কোটি কোটি টাকার অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলছে।
নিজের বক্তব্যে অয়ন ভাটনগর বলেন, সংগঠনের অদূর ভবিষ্যতের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে একক মঞ্চে একত্র করার সক্ষমতা প্রদর্শন করতেই প্রথম সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এই সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের সুরক্ষায় জনগণকে একত্রিত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানালে কত লাখ মানুষ সমবেত হবেন, সেই প্রশ্নও ছুড়ে দেন তিনি।
সনাতন ধর্মীয় উৎসব দশেরাকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে পরম শুভ শক্তির বিজয়ের মহ প্রতীক উল্লেখ করে ভাটনগর বলেন, এখন আর স্রেফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বললে চলবে না, প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করতে হবে। বক্তব্য প্রদানকালে তিনি আন্দোলনকারীদের ‘পোকামাকড়’ এবং ‘তেলাপোকা’ বলেও তীব্র কটাক্ষ হানেন।
বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের সম্প্রতি দেওয়া সরকার পরিবর্তনসংক্রান্ত মন্তব্যের সমালোচনা টেনে ভাটনগর প্রশ্ন তুলে বলেন, রাস্তাঘাট অচল করে রাজপথের বিক্ষোভ দিয়ে কীভাবে একটি বৈধ সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব? একই সাথে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের অযৌক্তিক দাবি এবং পুরো নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার কঠোর বিরোধিতা করেন তিনি।
ভাটনগর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আজ যদি অহেতুক প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করা হয়, তবে আগামীকাল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও তোলা হতে পারে। তাঁর মতে, কোনো অবাস্তব দাবির পক্ষে হুট করে ৫০ হাজার মানুষ রাজপথে জমায়েত হলেই সেটি মেনে নিতে হবে, এমন কোনো গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই।
বিগত ২০২৩ সালে ভারতে চালু হওয়া আধুনিক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভাটনগর বলেন, বিদ্যমান সেই আইনি প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাকেও সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করার পূর্বে ওই সুনির্দিষ্ট নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং বিগত দিনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের কর্মকাল সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক।
তিনি আরও যোগ করেন, মূলত ভারতীয় গণতন্ত্র ও সংবিধান সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়েই ‘লাল হিট জনতা পার্টি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর দাবি, সিজেপির আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো পুলিশ প্রশাসন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বিনষ্ট করা। এই অশুভ চক্রান্তে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (এআইএসএ) সরাসরি সিজেপিকে ইন্ধন ও সমর্থন জোগাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ভাটনগরের দাবি, এই সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান বিজেপি সরকারকে অন্যায়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেদের স্বার্থান্বেষী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের সার্বিক পরিবেশ ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সিজেপির এই সস্তা আন্দোলনে মূল রাজনীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বিক্ষোভ চলাকালে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও সাধারণ নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে আন্দোলনকারীদের চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ভাটনগর বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অপমান করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের মনে অবিশ্বাস তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি হুশিয়ারি দেন যে, আসন্ন দশেরার দিন থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র পতন শুরু হবে।
আয়োজিত সমাবেশে ভারতের বিখ্যাত কথক নৃত্যশিল্পী রিচা গুপ্ত বলেন, কীভাবে দেশকে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে প্রতিটি নাগরিকের ভাবা প্রয়োজন। নরেন্দ্র মোদির যোগ্য নেতৃত্বে বৈশ্বিক অঙ্গনে ভারতের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে দেশের তরুণ সমাজকে অন্যের অন্ধ অনুকরণ না করে সঠিক ও দেশপ্রেমের পথে পরিচালিত হওয়ার আহ্বান জানান রিচা।
অন্যদিকে, পবন নামের এক প্রবীণ সাংবাদিক দাবি করেন, রাজপথে চলমান আন্দোলনের কারণে দিল্লির স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি রুপির বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে ক্ষতির অংক খুব দ্রুত ১০ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এই আর্থিক হিসাবের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য তুলে ধরা হয়নি।
জনপ্রিয় কীটনাশক ব্র্যান্ড ‘হিট’-এর নামের সাথে মিল রেখে রসিকতা করে পবন বলেন, ‘যেখানে তেলাপোকা থাকবে, সেখানে হিট অবশ্যই থাকবে।’ তিনি জানান, গত তিন দিন ধরে ‘লাল হিট জনতা পার্টি’র সার্বিক কার্যক্রম তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
সংগঠনের পরিধি প্রসঙ্গে ভাটনগর দাবি করেন, বর্তমানে দূরপ্রাচ্যের কানাডা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রবাসীদের থেকেও তাঁদের এই নতুন প্ল্যাটফর্ম অভূতপূর্ব সমর্থন পাচ্ছে। পরিশেষে সমাবেশের বক্তারা ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার বাইরে এসে সরাসরি রাজপথে সক্রিয় হওয়া এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী সকল নাগরিকদের এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।























