Dhaka ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

স্বৈরাচারের পথ খুললে জুলাই শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে: প্রধানমন্ত্রী

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০২:৫২:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩ বার দেখা হয়েছে

রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে গিয়ে যদি দেশে পুনরায় কোনো স্বৈরাচারী শক্তির (আওয়ামী লীগ) ফিরে আসার পথ তৈরি করে দেওয়া হয়, তবে তা ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মহান শহীদ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সাথে চরম গাদ্দারি বা বিশ্বাসভঙ্গের শামিল হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল অবশ্যই সরকারের নানা নীতি ও কাজের সমালোচনা করবে, তবে সেই প্রতিবাদ ও অবস্থান হতে হবে সম্পূর্ণ গঠনমূলক। কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে দেশকে পুনরায় পেছনের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী উদ্যান প্রাঙ্গণে নির্মিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’-এর শুভ ফলক উন্মোচন এবং আধুনিকায়ন করা উদ্যানের শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অনুপস্থিতিতে গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈষম্যবিরোধী জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই বিশেষ সরকারি অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে তাঁরা এই আয়োজনে উপস্থিত হননি। যাদের জীবনের মহতী আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষরণের বিনিময়ে আজ তাঁরা বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যের সুনির্দিষ্ট পরিচয় লাভ করেছেন, সেই বীর শহীদ ও আহতদের স্বজনদের পাশে তাঁদের সশরীরে দাঁড়ানো উচিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিরোধীদলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “সরকারের সাথে আপনাদের সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বা মতপার্থক্য রয়েছে, সেটি রাজনৈতিকভাবে থাকতেই পারে। এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যে বীর মানুষগুলোর পরম আত্মত্যাগের কারণে, জীবন উৎসর্গের কারণে, হাত-পা ও চোখ হারানোর বিনিময়ে আজ আপনারা বিরোধীদলীয় নেতা এবং সম্মানিত জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ ও পরিচয় পেয়েছেন, সেই মানুষগুলোর পাশে তো অন্তত আপনাদের দেখা যাচ্ছে না।”

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিরোধী দল যদি সত্যিই বৈষম্যবিরোধী জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে অন্তরে ধারণ করে থাকে, তবে কোনো অজুহাত ছাড়াই জুলাই শহীদদের পরিবারের সদস্যদের পাশে তাদের আজ উপস্থিত থাকা উচিত ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার ও বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য বা ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এবং শহীদদের পরম আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জায়গায় কোনো প্রকার রাজনৈতিক বিভাজন থাকা উচিত নয়।

সরকারগঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই দেশকে কারা পরিচালনা করবে, তা দেশের আপামর জনগণ নিজেদের মূল্যবান ভোটাধিকারের মাধ্যমেই সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রদত্ত রায়ের ওপর ভিত্তি করেই বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং অপরাপর দলগুলো সংসদের বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছে।

সরকারপ্রধান আরও বলেন, নির্বাচনের পূর্বে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রার্থীরা স্ব স্ব প্রতীকে জনগণের দুয়ারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন। পরিশেষে এ দেশের সচেতন জনগণ নিজেদের পরম গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাই দেশের শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষেরই আমজনতার প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্বশীল ও সুপরিকল্পিত ভূমিকা পালন করা জরুরি।

তারেক রহমান উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সব ইস্যুতে একমত হওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। সংবিধান পরিমার্জন, আধুনিকায়ন বা সার্বিক সংস্কার ইস্যুতে নানা রূপ মতভেদ থাকতেই পারে। তবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা, নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান তৈরি, সুচিকিৎসা এবং মানসম্মত শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে অতি দ্রুত জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজপথের অহেতুক বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যকর আলোচনা, গঠনমূলক যুক্তি-তর্ক ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও দোষারোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের আমজনতার সার্বিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের অভিন্ন লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ অভিন্ন—তা হলো এ দেশের মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। প্রতিটি নাগরিকের অবাধ ভোটাধিকার, স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার, মানসম্মত শিক্ষাসুবিধা, উন্নত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই ছিল তাঁদের প্রধান স্বপ্ন।

তিনি আরও যোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদদের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়েই বাংলাদেশ আজ পুনরায় এক মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জনগণ তাঁদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই নিজেদের পছন্দের সরকার নির্বাচিত করতে পেরেছে। আজ উন্মোচিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে মোট ৮১৩ জন শহীদ বীরের নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সংরক্ষিত করা হয়েছে, যা আগামী প্রজন্মকে দেশের প্রতি নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কথা সবসময় স্মরণ করিয়ে দেবে।

বিএনপি চেয়ারম্যান দৃঢ়তার সাথে বলেন, তাঁর রাজনৈতিক দল বিএনপি যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে, ঠিক একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন চেতনাকেও হৃদয়ে লালন করে। সরকার গঠনের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনের সকল আহত যোদ্ধাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শহীদ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন, নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেশজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একসাথে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারণ এডিস মশা কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বা বিরোধী দল চিনে কামড়ায় না; এটি যেকোনো মানুষকে সমানভাবে আক্রান্ত করতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দূরত্ব ভুলে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি তথ্য প্রকাশ করে জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বিএনসিসি, স্কাউট, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সমন্বয়ে যৌথ বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে নিজ নিজ এলাকায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উদ্যানটি দীর্ঘদিন সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকার পর নতুন করে সংস্কার শেষে আজ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলো। তবে আধুনিকায়নের নামে প্রাচীন ও পুরাতন গাছপালার যেন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি। প্রাকৃতিক রূপকে অক্ষুণ্ণ রেখে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। পরিশেষে তিনি মনে করিয়ে দেন—উদ্যান, স্মৃতিস্তম্ভ, জাতীয় গ্রন্থাগার ও উদ্যানভিত্তিক বাগানসমূহ এ দেশের জনগণের মূল্যবান আমানত; তাই এগুলো সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।

আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্টজনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো অসংখ্য বীর শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

স্বৈরাচারের পথ খুললে জুলাই শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে: প্রধানমন্ত্রী

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০২:৫২:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে গিয়ে যদি দেশে পুনরায় কোনো স্বৈরাচারী শক্তির (আওয়ামী লীগ) ফিরে আসার পথ তৈরি করে দেওয়া হয়, তবে তা ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মহান শহীদ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সাথে চরম গাদ্দারি বা বিশ্বাসভঙ্গের শামিল হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল অবশ্যই সরকারের নানা নীতি ও কাজের সমালোচনা করবে, তবে সেই প্রতিবাদ ও অবস্থান হতে হবে সম্পূর্ণ গঠনমূলক। কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে দেশকে পুনরায় পেছনের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী উদ্যান প্রাঙ্গণে নির্মিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’-এর শুভ ফলক উন্মোচন এবং আধুনিকায়ন করা উদ্যানের শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অনুপস্থিতিতে গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈষম্যবিরোধী জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই বিশেষ সরকারি অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে তাঁরা এই আয়োজনে উপস্থিত হননি। যাদের জীবনের মহতী আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষরণের বিনিময়ে আজ তাঁরা বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যের সুনির্দিষ্ট পরিচয় লাভ করেছেন, সেই বীর শহীদ ও আহতদের স্বজনদের পাশে তাঁদের সশরীরে দাঁড়ানো উচিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিরোধীদলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “সরকারের সাথে আপনাদের সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বা মতপার্থক্য রয়েছে, সেটি রাজনৈতিকভাবে থাকতেই পারে। এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যে বীর মানুষগুলোর পরম আত্মত্যাগের কারণে, জীবন উৎসর্গের কারণে, হাত-পা ও চোখ হারানোর বিনিময়ে আজ আপনারা বিরোধীদলীয় নেতা এবং সম্মানিত জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ ও পরিচয় পেয়েছেন, সেই মানুষগুলোর পাশে তো অন্তত আপনাদের দেখা যাচ্ছে না।”

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিরোধী দল যদি সত্যিই বৈষম্যবিরোধী জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে অন্তরে ধারণ করে থাকে, তবে কোনো অজুহাত ছাড়াই জুলাই শহীদদের পরিবারের সদস্যদের পাশে তাদের আজ উপস্থিত থাকা উচিত ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার ও বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য বা ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এবং শহীদদের পরম আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জায়গায় কোনো প্রকার রাজনৈতিক বিভাজন থাকা উচিত নয়।

সরকারগঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই দেশকে কারা পরিচালনা করবে, তা দেশের আপামর জনগণ নিজেদের মূল্যবান ভোটাধিকারের মাধ্যমেই সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রদত্ত রায়ের ওপর ভিত্তি করেই বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং অপরাপর দলগুলো সংসদের বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছে।

সরকারপ্রধান আরও বলেন, নির্বাচনের পূর্বে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রার্থীরা স্ব স্ব প্রতীকে জনগণের দুয়ারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন। পরিশেষে এ দেশের সচেতন জনগণ নিজেদের পরম গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাই দেশের শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষেরই আমজনতার প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্বশীল ও সুপরিকল্পিত ভূমিকা পালন করা জরুরি।

তারেক রহমান উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সব ইস্যুতে একমত হওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। সংবিধান পরিমার্জন, আধুনিকায়ন বা সার্বিক সংস্কার ইস্যুতে নানা রূপ মতভেদ থাকতেই পারে। তবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা, নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান তৈরি, সুচিকিৎসা এবং মানসম্মত শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে অতি দ্রুত জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজপথের অহেতুক বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যকর আলোচনা, গঠনমূলক যুক্তি-তর্ক ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও দোষারোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের আমজনতার সার্বিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের অভিন্ন লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ অভিন্ন—তা হলো এ দেশের মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। প্রতিটি নাগরিকের অবাধ ভোটাধিকার, স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার, মানসম্মত শিক্ষাসুবিধা, উন্নত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই ছিল তাঁদের প্রধান স্বপ্ন।

তিনি আরও যোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদদের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়েই বাংলাদেশ আজ পুনরায় এক মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জনগণ তাঁদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই নিজেদের পছন্দের সরকার নির্বাচিত করতে পেরেছে। আজ উন্মোচিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে মোট ৮১৩ জন শহীদ বীরের নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সংরক্ষিত করা হয়েছে, যা আগামী প্রজন্মকে দেশের প্রতি নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কথা সবসময় স্মরণ করিয়ে দেবে।

বিএনপি চেয়ারম্যান দৃঢ়তার সাথে বলেন, তাঁর রাজনৈতিক দল বিএনপি যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে, ঠিক একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন চেতনাকেও হৃদয়ে লালন করে। সরকার গঠনের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনের সকল আহত যোদ্ধাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শহীদ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন, নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেশজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একসাথে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারণ এডিস মশা কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বা বিরোধী দল চিনে কামড়ায় না; এটি যেকোনো মানুষকে সমানভাবে আক্রান্ত করতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দূরত্ব ভুলে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি তথ্য প্রকাশ করে জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বিএনসিসি, স্কাউট, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সমন্বয়ে যৌথ বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে নিজ নিজ এলাকায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উদ্যানটি দীর্ঘদিন সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকার পর নতুন করে সংস্কার শেষে আজ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলো। তবে আধুনিকায়নের নামে প্রাচীন ও পুরাতন গাছপালার যেন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি। প্রাকৃতিক রূপকে অক্ষুণ্ণ রেখে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। পরিশেষে তিনি মনে করিয়ে দেন—উদ্যান, স্মৃতিস্তম্ভ, জাতীয় গ্রন্থাগার ও উদ্যানভিত্তিক বাগানসমূহ এ দেশের জনগণের মূল্যবান আমানত; তাই এগুলো সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।

আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্টজনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো অসংখ্য বীর শহীদ পরিবারের সদস্যরা।