Dhaka ০৯:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

ফ্রান্সজুড়ে ভয়াবহ সহিংস বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১২০০ ও আহত ১৫০ পুলিশ

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১২:৪০:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার দেখা হয়েছে

জীবনযাত্রার চড়া অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র সংকট ও জরাজীর্ণ কাঠামোর প্রতিবাদে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে সূচিত সাধারণ বিক্ষোভ চরম ভয়াবহ সহিংসতা ও দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে। গত শনিবার অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী এই বিশাল বিক্ষোভে একযোগে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার আন্দোলনকারী অংশ নেন। প্যারিসসহ দেশের প্রধান প্রধান বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কৌশলগত স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, নির্বিচার লুটপাট ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২০০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষে বিশেষ দাঙ্গা পুলিশ অগণিত কাঁদানে গ্যাসের শেল ও তীব্র জলকামান ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর আনুষ্ঠানিক ভাষ্য অনুযায়ী, সহিংসতা থামাতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির ছোট-বড় বিভিন্ন নগরীতে শনিবার দিনভর চরম চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ন্যায্য দাবির মূল বিক্ষোভকে ঢাল বানিয়ে একদল অসাধু চক্র সহিংসতার মাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন, ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ যানবাহনে হামলার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি স্ট্র্যাটেজিক স্থানে ভয়াল আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি শত বছরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভবনগুলোও উন্মত্ত তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি।

রাজধানী প্যারিসে বিকেলের দিকে আন্দোলনকারীদের মূল র‍্যালিটি তুলনামূলক শান্ত ও সুশৃঙ্খল থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে সার্বিক দৃশ্যপট বদলে যায়। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উগ্র দল মূল রাস্তায় আগুন জ্বেলে যানবাহন পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। শহরের সুবিখ্যাত ‘রিপাবলিক চত্বর’-এ দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। শহরের বিপণিবিতানগুলোতে চালানো হয় বেপরোয়া লুটপাট; যার ফলে অন্তত একটি নামী রেস্তোরাঁ অগ্নিকাণ্ডে শতভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিক্ষোভকারীদের নিজেদের কয়েকটি দলের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ মারামারির চিত্র দেখা গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত থাকা দাঙ্গা পুলিশকে প্যারিসের মধ্যাঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের তাড়িয়ে নিয়ে লাঠিচার্জ করতে দেখা যায়। বিশৃঙ্খলা দমাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। ১ শত বছরের পুরোনো ও জনপ্রিয় ‘লা বারিক’ নামের একটি ঐতিহ্যবাহী পানশালায় সরাসরি আগুন দেওয়া হয়। রাজধানীর বড় বড় শপিং সেন্টার ভাঙচুরের পাশাপাশি পোশাক ও খাবারের দোকান লুটপাট করা হয়। এছাড়া লিলি শহরের একটি অ্যাপল শোরুমের দরজা ভেঙে সব মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দাঙ্গাবাজেরা।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক সংকট তৈরি হয় লিমোজ শহরে। সেখানে অন্তত ১৪৩ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসবাহী পুরোনো টাউন হল ভবনে দুষ্কৃতকারীরা সরাসরি আগুন ধরিয়ে দিলে মুহূর্তেই ভবনের ছাদের এক বিশাল অংশ ধসে পড়ে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরলস চেষ্টা চালালেও প্রাচীন ভবনটির অপরিমেয় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়নি। স্থানীয় নগর প্রশাসন জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে ঐতিহাসিক ভবনটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।

একইভাবে লিওঁ শহরেও তাণ্ডব ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। শহরের বর্তমান মেয়র গ্রেগরি দুসে তাদের ঐতিহ্যবাহী পর্যটন দপ্তরের প্রশাসনিক ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে পুরো শহরের জন্য এক ‘হৃদয়বিদারক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভবনটি শহরের অত্যন্ত সুপরিচিত ও ঐতিহাসিক স্মারক হওয়ায় এর এমন ক্ষতি সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর আঘাত হেনেছে। স্থানীয় পুলিশের অভিযোগ, অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা যখন আগুন নেভাতে এসেছিলেন, তখন কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি তাঁদের কাজে সরাসরি বাধা তৈরি করে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাঁত এতিয়েন শহরেও এক গুরুতর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। শহরের মেয়র রেজিস হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, এক ভয়াবহ বিস্ফোরক অস্ত্রের আঘাতে এক প্রতিবাদী তরুণ হাতের কবজি হারিয়েছেন। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক’ অ্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই এমন ট্র্যাজেডি ঘটা অনুচিত ছিল।

এ ছাড়া গ্রেনোবল, আভিনিয়োঁ, পো, মনপেলিয়ে এবং ভ্যালঁসসহ বিভিন্ন ছোট-বড় শহরে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গ্রেনোবল শহরের একটি সরু গলি দিয়ে মুখঢাকা কয়েকজনকে পর্যটকবাহী ট্রেন চালিয়ে ৩ জন দাঙ্গা পুলিশের দিকে দ্রুতগতিতে চালিয়ে নেওয়ার দৃশ্য নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসের বেশ কয়েকটি জোন ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করে সহিংসতা চালানো হয়েছে। এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে মুখ ঢাকা উগ্র গোষ্ঠী জড়িত বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট ও ভঙ্গুর অবকাঠামোর প্রতিবাদে অগণিত শিক্ষার্থী রাজপথে আন্দোলন করে আসছিলেন। শনিবার তাদের এই দাবির সাথে যোগ দেয় দেশের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন এবং অন্যান্য বিদ্রোহী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এর মধ্যে ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে তৈরি হওয়া বহুল আলোচিত ‘হলুদ জ্যাকেট’ (ইয়েলো ভেস্ট) আন্দোলনের সমর্থকরাও সামিল ছিলেন।

বর্তমানে পুরো ফরাসি রাজনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। আগামী বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, আগামী এপ্রিলে হতে যাওয়া সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল জাতীয় সমাবেশের নেতা মেরিন লে পেন ও বামপন্থী ফ্রান্স আনবোডের প্রধান জ্যাঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে মূল লড়াইয়ের পূর্বাভাস মিলছে।

বামপন্থী নেতা মেলঁশোঁ নিজে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। তবে একই সাথে তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত লুটপাট ও আগুনের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর এই মন্তব্যকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু।

প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতীতে কখনো এমন তীব্র ও পরিকল্পিত সহিংসতার মুখোমুখি হয়নি। কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আন্দোলনকে নিজেদের মহড়া হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সহিংসতার মাধ্যমে ফরাসি জনগণের ওপর কোনো অনৈতিক রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে দেওয়া হবে না বলে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

অন্যদিকে, মেরিন লে পেন পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য আন্দোলনকে চরমপন্থী বামপন্থীরা জিম্মি করে ফেলেছে। পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারি কার্যালয়, টাউন হল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলায় যুক্ত সকল অপরাধীকে কঠোর বিচারে মুখোমুখি করা হবে।

সংকট সামাল দিতে অবশ্য সরকার কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। গত ৮ অক্টোবর এক টিভি সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষা খাতে নতুন করে ৩ হাজার শিক্ষক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করেন। তবে সরকারের এমন আশ্বাসের পরও আন্দোলন থামেনি; বরং প্রতিদিন তা আরও রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করছে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

ফ্রান্সজুড়ে ভয়াবহ সহিংস বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১২০০ ও আহত ১৫০ পুলিশ

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১২:৪০:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জীবনযাত্রার চড়া অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র সংকট ও জরাজীর্ণ কাঠামোর প্রতিবাদে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে সূচিত সাধারণ বিক্ষোভ চরম ভয়াবহ সহিংসতা ও দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে। গত শনিবার অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী এই বিশাল বিক্ষোভে একযোগে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার আন্দোলনকারী অংশ নেন। প্যারিসসহ দেশের প্রধান প্রধান বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কৌশলগত স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, নির্বিচার লুটপাট ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২০০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষে বিশেষ দাঙ্গা পুলিশ অগণিত কাঁদানে গ্যাসের শেল ও তীব্র জলকামান ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর আনুষ্ঠানিক ভাষ্য অনুযায়ী, সহিংসতা থামাতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির ছোট-বড় বিভিন্ন নগরীতে শনিবার দিনভর চরম চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ন্যায্য দাবির মূল বিক্ষোভকে ঢাল বানিয়ে একদল অসাধু চক্র সহিংসতার মাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন, ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ যানবাহনে হামলার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি স্ট্র্যাটেজিক স্থানে ভয়াল আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি শত বছরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভবনগুলোও উন্মত্ত তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি।

রাজধানী প্যারিসে বিকেলের দিকে আন্দোলনকারীদের মূল র‍্যালিটি তুলনামূলক শান্ত ও সুশৃঙ্খল থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে সার্বিক দৃশ্যপট বদলে যায়। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উগ্র দল মূল রাস্তায় আগুন জ্বেলে যানবাহন পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। শহরের সুবিখ্যাত ‘রিপাবলিক চত্বর’-এ দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। শহরের বিপণিবিতানগুলোতে চালানো হয় বেপরোয়া লুটপাট; যার ফলে অন্তত একটি নামী রেস্তোরাঁ অগ্নিকাণ্ডে শতভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিক্ষোভকারীদের নিজেদের কয়েকটি দলের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ মারামারির চিত্র দেখা গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত থাকা দাঙ্গা পুলিশকে প্যারিসের মধ্যাঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের তাড়িয়ে নিয়ে লাঠিচার্জ করতে দেখা যায়। বিশৃঙ্খলা দমাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। ১ শত বছরের পুরোনো ও জনপ্রিয় ‘লা বারিক’ নামের একটি ঐতিহ্যবাহী পানশালায় সরাসরি আগুন দেওয়া হয়। রাজধানীর বড় বড় শপিং সেন্টার ভাঙচুরের পাশাপাশি পোশাক ও খাবারের দোকান লুটপাট করা হয়। এছাড়া লিলি শহরের একটি অ্যাপল শোরুমের দরজা ভেঙে সব মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দাঙ্গাবাজেরা।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক সংকট তৈরি হয় লিমোজ শহরে। সেখানে অন্তত ১৪৩ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসবাহী পুরোনো টাউন হল ভবনে দুষ্কৃতকারীরা সরাসরি আগুন ধরিয়ে দিলে মুহূর্তেই ভবনের ছাদের এক বিশাল অংশ ধসে পড়ে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরলস চেষ্টা চালালেও প্রাচীন ভবনটির অপরিমেয় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়নি। স্থানীয় নগর প্রশাসন জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে ঐতিহাসিক ভবনটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।

একইভাবে লিওঁ শহরেও তাণ্ডব ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। শহরের বর্তমান মেয়র গ্রেগরি দুসে তাদের ঐতিহ্যবাহী পর্যটন দপ্তরের প্রশাসনিক ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে পুরো শহরের জন্য এক ‘হৃদয়বিদারক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভবনটি শহরের অত্যন্ত সুপরিচিত ও ঐতিহাসিক স্মারক হওয়ায় এর এমন ক্ষতি সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর আঘাত হেনেছে। স্থানীয় পুলিশের অভিযোগ, অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা যখন আগুন নেভাতে এসেছিলেন, তখন কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি তাঁদের কাজে সরাসরি বাধা তৈরি করে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাঁত এতিয়েন শহরেও এক গুরুতর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। শহরের মেয়র রেজিস হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, এক ভয়াবহ বিস্ফোরক অস্ত্রের আঘাতে এক প্রতিবাদী তরুণ হাতের কবজি হারিয়েছেন। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক’ অ্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই এমন ট্র্যাজেডি ঘটা অনুচিত ছিল।

এ ছাড়া গ্রেনোবল, আভিনিয়োঁ, পো, মনপেলিয়ে এবং ভ্যালঁসসহ বিভিন্ন ছোট-বড় শহরে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গ্রেনোবল শহরের একটি সরু গলি দিয়ে মুখঢাকা কয়েকজনকে পর্যটকবাহী ট্রেন চালিয়ে ৩ জন দাঙ্গা পুলিশের দিকে দ্রুতগতিতে চালিয়ে নেওয়ার দৃশ্য নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসের বেশ কয়েকটি জোন ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করে সহিংসতা চালানো হয়েছে। এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে মুখ ঢাকা উগ্র গোষ্ঠী জড়িত বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট ও ভঙ্গুর অবকাঠামোর প্রতিবাদে অগণিত শিক্ষার্থী রাজপথে আন্দোলন করে আসছিলেন। শনিবার তাদের এই দাবির সাথে যোগ দেয় দেশের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন এবং অন্যান্য বিদ্রোহী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এর মধ্যে ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে তৈরি হওয়া বহুল আলোচিত ‘হলুদ জ্যাকেট’ (ইয়েলো ভেস্ট) আন্দোলনের সমর্থকরাও সামিল ছিলেন।

বর্তমানে পুরো ফরাসি রাজনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। আগামী বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, আগামী এপ্রিলে হতে যাওয়া সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল জাতীয় সমাবেশের নেতা মেরিন লে পেন ও বামপন্থী ফ্রান্স আনবোডের প্রধান জ্যাঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে মূল লড়াইয়ের পূর্বাভাস মিলছে।

বামপন্থী নেতা মেলঁশোঁ নিজে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। তবে একই সাথে তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত লুটপাট ও আগুনের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর এই মন্তব্যকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু।

প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতীতে কখনো এমন তীব্র ও পরিকল্পিত সহিংসতার মুখোমুখি হয়নি। কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আন্দোলনকে নিজেদের মহড়া হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সহিংসতার মাধ্যমে ফরাসি জনগণের ওপর কোনো অনৈতিক রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে দেওয়া হবে না বলে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

অন্যদিকে, মেরিন লে পেন পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য আন্দোলনকে চরমপন্থী বামপন্থীরা জিম্মি করে ফেলেছে। পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারি কার্যালয়, টাউন হল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলায় যুক্ত সকল অপরাধীকে কঠোর বিচারে মুখোমুখি করা হবে।

সংকট সামাল দিতে অবশ্য সরকার কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। গত ৮ অক্টোবর এক টিভি সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষা খাতে নতুন করে ৩ হাজার শিক্ষক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করেন। তবে সরকারের এমন আশ্বাসের পরও আন্দোলন থামেনি; বরং প্রতিদিন তা আরও রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করছে।