ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক এক আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে ‘বিপজ্জনক বাগাড়ম্বর’ এবং আভিজাত্যপ্রদর্শনী উসকানি হিসেবে তীব্রভাবে আখ্যাত করেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সাথে নয়াদিল্লি যদি তাদের দীর্ঘদিনের ‘আধিপত্যবাদী মানসিকতা’ পরিহার না করে, তবে সমগ্র দক্ষিণ এশীয় মহাদেশের সার্বিক শান্তি, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখোমুখি হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে দেশটি।
সম্প্রতি ভারতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, “ভবিষ্যতে যদি পাকিস্তান ভিত্তিক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারতে কোনো ধরনের হামলা চালায়, তবে নয়াদিল্লি অতীতের চেয়েও বহুগুণ কঠোর ও ভয়াবহ পাল্টা জবাব দেবে।”
আজ শনিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখ্য মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যকে পাকিস্তানের সার্বিক ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ আগ্রাসনের হুমকি বলে অভিহিত করেন।
নয়াদিল্লির প্রতি অনতিবিলম্বে এসব উসকানিমূলক মন্তব্য ও সামরিক বাগাড়ম্বর পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, “ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য মূলত ভারতের চিরচেনা আধিপত্যবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের সৃষ্ট মূল ঝুঁকির আসল প্রমাণ। পাকিস্তান সর্বদা তার ভূখণ্ডগত সম্পূর্ণ অখণ্ডতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের বিদেশি আগ্রাসনের মুখোমুখি হলে পাকিস্তান তাৎক্ষণিক কঠোরতম পাল্টা জবাব দেবে।”
উল্লেখ্য, গত ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অনন্তনাগ জেলার পেহেলগামে সংঘটিত এক প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার জেরে মে মাসে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সামরিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল দুই পরাশক্তি প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। নয়াদিল্লির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল— পেহেলগামে ২৬ জন নিরীহ পর্যটককে বর্বরোচিতভাবে হত্যাকারী সন্ত্রাসীরা ছিল মূলত পাকিস্তানি নাগরিক। তবে ইসলামাবাদ শুরু থেকেই ভারতের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছিল এবং ঘটনার নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত নিশ্চিত করতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ভারতের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চরম সামরিক সূত্রপাত ঘটে। ইসলামাবাদের দাবি, কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই ভারত এই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ওই বিধ্বংসী সংঘাত অবশেষে গত বছরের ১০ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে থমকে যায়।
আজ শনিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে ব্রিফিংকালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গত বছরের মে মাসে সংঘটিত সামরিক যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির কথা ভারতকে আবারও স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান যে নিজের সীমান্ত রক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে শতভাগ সক্ষম এবং সংকল্পবদ্ধ, তা ইতোমধ্যে বিশ্বমঞ্চে তারা প্রমাণ করেছে।
তিনি আরও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সতর্ক করে বলেন, “এই বিষয়ে ভারত বা অন্য কারও কোনো সংশয় বা অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়; কোনো ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত বহিঃশত্রুর সামরিক আগ্রাসন রুখে দিয়ে নিজেদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় পাকিস্তান বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।”
বক্তব্যের শেষাংশে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মুখপাত্র স্পষ্ট করেন, “পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ধৈর্য, সংযম এবং বিশ্ব শান্তির প্রতি সুদৃঢ় অঙ্গীকারকে যেন কেউ ভুলবশত তাদের দুর্বলতা হিসেবে গণ্য না করে। সীমানা লংঘনকারী যেকোনো আগ্রাসনের অত্যন্ত নির্মম ও উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।”























