মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার অন্তর্গত কামারচাক ইউনিয়নের বুক দিয়ে বয়ে চলা লাঘাটা নদীর ওপর প্রস্তাবিত একটি সেতুর নির্মাণকাজ বিগত পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তা পুরোপুরি সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। এর ওপর সেতুর দুই পাশে কোনো ধরনের প্রবেশ বা সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) তৈরি না করায় আশপাশের অন্তত ১২টি গ্রামের হাজার হাজার অধিবাসী অশেষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রকাশ, মোট ৪ কোটি ৪ লাখ ৩ হাজার ৪৪৯ টাকা বাজেটে ৬০ মিটার পরিমাপের এই সেতুর অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ৬ জুলাই। চুক্তিসংক্রান্ত বিবরণী অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি সংস্থা ‘প্রিন্স মামুন (জেভি)’-এর ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বরের মধ্যেই সমগ্র কাজ সম্পন্ন করে বুঝিয়ে দেওয়ার সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেতুর মূল কাঠামোর সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত আইনগত জটিলতা এবং বর্ষার দিনে ভরা মৌসুমে উপযোগী মাটি সংগ্রহ করার চরম অক্ষমতার কারণে চলতি বছরেও আদৌ এই প্রজেক্টের কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আশঙ্কা ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এর ফলশ্রুতিতে প্রতিদিনের যাতায়াতে চরম দুর্দশায় পড়েছেন রাজনগর উপজেলার দক্ষিণ ইসলামপুর, খাস প্রেমনগর, মিটিপুর, ভোলানগর, শ্যামেরকোনা, নওয়াগাঁও, আলালপুর, হাটিকরাইয়া, গোবیندপুর ও কালইকুনাসহ সংলগ্ন এলাকার মোট ১২টি গ্রামের সাধারণ অধিবাসীরা।
নিয়মিত উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং স্থানীয় হাওরের তাজা মাছ বিকল্প দীর্ঘ পথ ঘুরে দূরবর্তী হাটে নিয়ে বিক্রি করতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে, যার ফলে অর্থনৈতিকভাবে চরম লোকসানের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় পেশাজীবীরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য এবং সংকটাপন্ন মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি চিকিৎসায় হাসপাতালে স্থানান্তরে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বজনদের। তদুপরি সাধারণ ব্যবসার মালামাল বহন এবং খেতের ফসল বিক্রির হাটে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ ও ব্যয়িত সময় এক লাফে দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী অধিবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বহু বছর পার হয়ে গেলেও দৃষ্টিনন্দন সেতুটি দিয়ে পারাপার হওয়ার কোনো উপায় তৈরি হয়নি। অত্যন্ত কষ্ট ও দুর্ভোগ সহ্য করে প্রতিদিন তাঁদের চলাচল বজায় রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভরা বর্ষার মৌসুমে ঝুঁকি নিয়ে খেয়া নৌকার ওপর ভরসা করে নদী পার হতে হয়। তাঁরা অবিলম্বে সংযোগ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন করে সেতুটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
উৎসিত সমস্যার বিষয়ে এলজিইডির রাজনগর উপজেলা প্রকৌশলী পদে কর্মরত আব্দুল গনি জানান, নির্মিত সেতুর মূল কাঠামোর অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে বর্ষার কারণে উপযুক্ত মাটি পাওয়ার অভাব থাকায় সংযোগ রাস্তার কাজ কিছুটা পিছিয়ে যায়। এর সাথে যোগ হয়েছে জমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতা। এসব জটিল সমস্যা দ্রুত নিরসন করে অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রশাসন চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার মন্তব্য করেছেন যে, বর্ণিত সেতুর কাজের অনাকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বের ইস্যুটি নিয়ে সম্প্রতি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির পর্যালোচনামূলক সভায় গুরুত্বের সাথে আলাপ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারাও লিখিত ও মৌখিকভাবে তাঁকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেছেন।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া মোহাম্মদ ফারুক আহমদ বলেন, তিনি জেলায় একেবারে নতুন যোগদান করেছেন। তাই সেতু নির্মাণের বর্তমান সর্বশেষ পরিস্থিতি ও বিলম্বের মূল কারণগুলো সরজমিন খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সেতুর কাজ দীর্ঘকাল ঝুলিয়ে রাখার কারণ জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্স মামুন (জেভি)’-এর পরিচালনা কর্তৃপক্ষের সাথে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও তাদের কোনো মতামত বা সাড়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।


























