অস্ট্রেলিয়ার সিডনির জনপ্রিয় বন্ডাই বিচে একটি ইহুদি ধর্মীয় উৎসবে সশস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ। রোববার সন্ধ্যায় হানুকার প্রথম দিনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাকে পুলিশ ‘সন্ত্রাসী আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, এই হামলা ছিল ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত আক্রমণ। তিনি একে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যে মানসিক যন্ত্রণা ও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য পুলিশের বরাতে জানানো হয়েছে, হামলার পর অন্তত ৪০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পুলিশ কমিশনার মাল ল্যানিয়ন জানান, ঘটনাস্থলেই ৫০ বছর বয়সী এক হামলাকারী নিহত হয়। তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে, যিনি দ্বিতীয় বন্দুকধারী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাকে আটক করা হয়েছে এবং তিনি গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। এ ঘটনায় তৃতীয় কোনো হামলাকারী জড়িত থাকার তথ্য নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, নিহত হামলাকারীর নামে ছয়টি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ছিল এবং ঘটনাস্থল থেকে ছয়টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে দুটি অপরিণত বিস্ফোরক ডিভাইস পাওয়া গেছে, যা সক্রিয় করা হয়নি বলে স্বস্তি প্রকাশ করেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, ‘চানুকা বাই দ্য সি’ নামের ওই অনুষ্ঠানে এক হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হামলা শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কালো পোশাক পরা দুই সশস্ত্র ব্যক্তি ভিড় লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কয়েক মিনিট ধরে একের পর এক গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি সাহসিকতার সঙ্গে এক হামলাকারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেন। পরে ওই ব্যক্তি বন্দুকটি মাটিতে রেখে দেন। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ওই সাহসী ব্যক্তি একজন ফল ব্যবসায়ী। নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনস তাকে ‘প্রকৃত নায়ক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তার সাহসিকতায় বহু মানুষের প্রাণ বেঁচেছে।
হামলার পর বন্ডাই বিচ ও আশপাশের সড়ক সোমবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সাসান লে বলেন, শান্তি ও আশার প্রতীক একটি উৎসব ঘৃণার সহিংসতায় রক্তাক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ জানান, জাতীয় শোকের অংশ হিসেবে সোমবার অস্ট্রেলিয়ায় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং সরকার দেশ থেকে ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূলে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একে ঘৃণ্য ও জঘন্য আক্রমণ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ইরান, কাতারসহ বিভিন্ন দেশও হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে ভয়াবহ ও স্পষ্টভাবে ইহুদিবিদ্বেষী হামলা বলে মন্তব্য করেছেন।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ জেরুজালেম থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, হানুকার প্রথম মোমবাতি জ্বালাতে জড়ো হওয়া ইহুদিদের ওপর এই নিষ্ঠুর হামলা বিশ্বব্যাপী ইহুদি সম্প্রদায়কে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ইসলামিক সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিলও এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি একটি ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ঘটনা এবং সব অস্ট্রেলীয়ের উচিত ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর অস্ত্র আইনের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় জনসমাগমপূর্ণ স্থানে বন্দুক হামলা খুবই বিরল। তাই বন্ডাই বিচের মতো এলাকায় এমন ঘটনা দেশজুড়ে গভীর শোক ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
















