জুলাই গণ-আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন এলাকায় সংঘটিত রিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলায় দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পুনরায় জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আবু শামীম আজাদ উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও আইনি যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা শেষে এই জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
এর আগে পূর্বনির্ধারিত দিনে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তাবলয় ও বিশেষ প্রহরায় আদালত প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছান ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ সময় আদালত চত্বরে আইনজীবী, সংবাদকর্মী এবং তাঁর অসংখ্য রাজনৈতিক অনুসারী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পরে পুলিশি পাহারায় তাঁকে সুনির্দিষ্টভাবে আদালতকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।
আদালতে আইভীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন তাঁর নিয়োজিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন। শুনানিকালে তিনি আদালতকে অবহিত করেন যে, আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করে পুলিশ ইতিপূর্বে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে। পুলিশি সেই পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে বিস্ফোরকজাতীয় কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ বা আলামত কিংবা উক্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া আদালতের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট আইনি নোটিশ প্রদান করা সত্ত্বেও মামলার মূল বাদী এবং নিহত তুহিনের স্ত্রী আলেয়া আক্তার মিম আদালতে সশরীরে হাজির হননি।
আইনজীবী আওলাদ হোসেন আরও উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বেও এই মামলায় তাঁর মক্কেল আইভী আইনসম্মতভাবে জামিন লাভ করেছিলেন। যেহেতু তদন্তকারী সংস্থা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাঁর অপরাধে সংশ্লিষ্টতা পাননি এবং বাদীও অনুপস্থিত রয়েছেন, তাই পুলিশের দাখিলকৃত সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণপূর্বক আইভীর পুনরায় জামিন বহাল ও মঞ্জুরের জন্য আদালতের নিকট প্রার্থনা জানান তাঁরা।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) জাকির হোসেন আদালতকে জানান যে, পুলিশ কর্তৃক দাখিলকৃত এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তারা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় শীঘ্রই নারাজি পিটিশন দাখিল করবেন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন যে, কোন সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান ও আইনি যুক্তিতে নারাজি পিটিশন দেওয়া হবে। দুই পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ আইনি বিতর্ক ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর বিচারক জেলা ও দায়রা জজ আবু শামীম আজাদ সমস্ত নথি বিশ্লেষণ করে আইভীর পুনরায় জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
মামলার মূল এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন ব্র্যাক ব্যাংকের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর রিকশাচালক তুহিন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে মামলার প্রধান আসামি করা হয় এবং ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে উক্ত মামলার ১১ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
এদিকে আদালতের বিচারিক কার্যক্রম সফলভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর পুলিশি নিরাপত্তায় গাড়ি চড়ার প্রাক্কালে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সংবাদকর্মী ও সমর্থকদের সামনে হঠাৎ করেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ সময় তাঁকে অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, দাবিয়ে রাখা যাবে না’ স্লোগান দিতে শোনা যায়, যা তাৎক্ষণিকভাবে আদালত প্রাঙ্গণ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।


























