আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ থেকে মহাতারকা লিওনেল মেসির আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত বিদায় কেবল আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের মাঠের খেলার শক্তি বা কৌশলকেই কমিয়ে দেয়নি, বরং দেশটির প্রধান ফুটবল সংস্থাকেও ফেলে দিয়েছে এক বিশাল বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মুখে। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আলবিসেলেস্তেদের সাফল্যের প্রধান কান্ডারি ও মূল আকর্ষণ ছিলেন এই ফুটবল জাদুকর। তাঁর অনুপস্থিতিতে এখন কেবল মাঠের কৌশলগত শূন্যতাই তৈরি হয়নি, বরং মাঠের বাইরের অর্থনৈতিক ধস সামলানোও আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) জন্য এক অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা হতে চলেছে।
মেসি মাঠে সক্রিয় থাকা অবস্থায় বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার ফুটবলের ব্র্যান্ড ভ্যালু বা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য পৌঁছে গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় উচ্চতায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য গণমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালেও যেখানে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মাত্র ৬টি বৈশ্বিক স্পন্সর বা বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল, সেখানে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এএফএর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সংস্থাটি কেবল বিভিন্ন বহুজাতিক ও স্থানীয় বাণিজ্যিক চুক্তি থেকেই বছরে প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় করে থাকে, যা তাদের মোট বার্ষিক আয়ের অর্ধেকেরও বেশি। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনী ও বাণিজ্যিক আয়ের পেছনে মূল কেন্দ্রবিন্দু ও প্রধান আকর্ষণই ছিলেন লিওনেল মেসি। তাঁর এই ঐতিহাসিক বিদায়ের পর এখন এসব বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও স্পন্সরদের আগ্রহ ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের মাঝে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়।
মেসিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর উন্মাদনা এবং তার বাণিজ্যিক সুদূরপ্রসারী প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছিল তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিতে। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে অনুষ্ঠিত বেনিনের বিপক্ষে মেসির সেই বিদায়ী ম্যাচে টিকিট কাউন্টারে উন্মাদনা এমন চরমে পৌঁছেছিল যে, মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে স্টেডিয়ামের পুরো ৮৫ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল। স্বনামধন্য আর্থিক প্রকাশনা ‘আর্জেন্টাইন ফোর্বস’-এর তথ্য অনুযায়ী, কেবল ওই একটি মাত্র ম্যাচের টিকিট বিক্রি থেকেই এএফএর কোষাগারে জমা হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। শুধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিই নয়, ওই ম্যাচটি আন্তর্জাতিক টেলিভিশন ও ডিজিটাল সম্প্রচারেও বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ দর্শকপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক সাড়া তৈরি করেছিল।
এমতাবস্থায়, এলএমটেনের এই প্রস্থানের পর কেবল স্পন্সরশিপ চুক্তিই নয়, বরং জার্সি বিক্রি, লোভনীয় ম্যাচ টিকিটের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রচার স্বত্বের বাণিজ্যিক মূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে আলবিসেলেস্তেদের ম্যাচগুলোতে আগের মতো দর্শক এবং সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনির্দিষ্ট আকর্ষণ ধরে রাখাই এখন এএফএর প্রধানতম কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে, ফুটবল জাদুকরের এই অপার্থিব যুগের অবসান ঘটার পর আর্জেন্টিনার ফুটবল ব্র্যান্ডের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং মূল প্রবাহ সচল রাখাটাই হতে যাচ্ছে তাদের পরবর্তী সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।

























