প্রতিবেশী দেশ নেপালে ফের এক আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির উত্তর-মধ্যাঞ্চলে সংঘটিত আকস্মিক ভূমিধসের ফলে পাহাড়ি নদীগুলোর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত স্থাপনা এবং যোগাযোগ মাধ্যম ভেসে গেছে। এই আকস্মিক দুর্যোগ পরিস্থিতিতে স্থানীয় নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের গ্রামবাসীদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ ও আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে এখন পর্যন্ত সৌভাগ্যবশত কোনো ধরনের প্রাণহানি বা হতাহতের কোনো দুঃসংবাদ পাওয়া যায়নি বলে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
নেপালের প্রশাসনিক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সূত্রে জানা গেছে, দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে আনুমানিক ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত গোরখা জেলার দুর্গম চুনুব্রি (Chumnubri) গ্রামে হঠাৎ করেই বিশাল আকারের ভূমিধস আঘাত হানে। এই ভূমিধসের ফলে পাহাড়ি নদী বুধি গণ্ডকী (Budhi Gandaki)-র স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলশ্রুতিতে নদীর ভাটি অঞ্চলের দিকে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। বুধি গণ্ডকী নদীটি মূলত নেপালের অন্যতম প্রধান নদী ত্রিশূলী নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, এই নদীর ভাটিতে অবস্থিত আরেকটি উপনদীতে এর আগে গত আগস্ট মাসে একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময়কার সেই মর্মান্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ১ হাজার ৪৫৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল এবং এখনও পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
গোরখা জেলার জ্যেষ্ঠ ও দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্মকর্তা ধর্মেন্দ্র কুমার মিশ্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, নদীর ভাটিতে তীরবর্তী নিচু এলাকায় বসবাসকারী সকল গ্রামবাসীকে যেকোনো মূল্যে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, এই আকস্মিক বন্যার তোড়ে গোরখা জেলার প্রায় এক ডজন বসতবাড়ি এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুলন্ত সেতু সম্পূর্ণরূপে ভেসে গেছে। এ ছাড়াও নদীর পাড়ে অবস্থিত একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন বা চলমান শ্রমিকশিবিরও এই বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নিজস্ব একটি অফিসিয়াল পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন যে, ভূমিধসের তীব্র ঝুঁকিতে থাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল জগৎ (Jagat) এলাকা থেকে সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অন্তত ছয়জন নাগরিককে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি গণমাধ্যমকে জানান যে, পাহাড়ি কাদামাটি মিশ্রিত ঘোলা জলের প্রবল স্রোত নিয়ে নদীর পানির উচ্চতা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আকস্মিক বন্যায় গোরখা জেলার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী ধাদিং জেলার সংযোগ স্থাপনকারী একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক সেতুও সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। তবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শিবির ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেখানে কর্মরত আরও ১৮ জন শ্রমিক সময়মতো নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হয়েছেন বলে তিনি স্বস্তির খবর দিয়েছেন।
উদ্ভূত এই জরুরি পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ গোরখা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী তানাহুন, চিতওয়ান, পূর্ব নাওয়ালপারাসি এবং পশ্চিম নাওয়ালপারাসি জেলার সমস্ত নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক জরুরি সতর্কবার্তায় জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষকে সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন এবং প্রয়োজনে সরকারি অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে হাত বাড়িয়ে দিন। দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নেপাল পুলিশের বিশেষ উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেছে। পরিস্থিতি সার্বিক পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনে হেলিকপ্টার থেকেও আকাশপথে নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।























