ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত একটি পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি কঠোরহাতে দমন করতে রাজধানী নয়াদিল্লিজুড়ে নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান ও ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে দিল্লি পুলিশ। গত শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) পুলিশের পক্ষ থেকে জারি করা নিষেধাজ্ঞা ও কড়া সতর্কতা পুরোপুরি উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা যন্তর-মন্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের এই কর্মসূচি প্রতিহত করার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে নিরাপত্তা বহুগুণ জোরদার করা হয়, প্রধান প্রধান সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক বসানো হয় এবং সার্বিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সাম্প্রতিক এই সহিংস ও দমনপীড়নমূলক পদক্ষেপে এখন পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানে আটক ব্যক্তিদের তালিকায় বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। এর পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী, আইনজীবী, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং বিশিষ্ট অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাকেও পুলিশি আটকের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি জার্মানিতে বসবাসকারী জনপ্রিয় ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির আটক হওয়ার চাঞ্চল্যকর খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত সিজেপির শীর্ষস্থানীয় এই তিন নেতার সুনির্দিষ্ট অবস্থান কিংবা তাদের মুক্তির বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বা সন্তোষজনক তথ্য জানানো হয়নি।
এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট আরও চাঞ্চল্যকর হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় যে, সিজেপির শীর্ষ নেতারা বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর পূর্বেই বিমানবন্দর এলাকায় পুলিশি হস্তের শিকার হয়েছেন। শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং দলীয় দুই মুখপাত্রকে বহনকারী একটি উড়োজাহাজ নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটি নামার পরপরই নারী পুলিশ সদস্যদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল সরাসরি উড়োজাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে তাদের জোরপূর্বক আটক করে। পরবর্তীতে বিমানের ভেতর থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দিপকে পুলিশের এই চরম কর্তৃত্ববাদী ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, বিমান থেকে নামার পরও তো তাদের বাইরে আটক করা যেত, কিন্তু বিমানের ভেতরে সরাসরি পুলিশ প্রবেশ করে যেভাবে আটক করেছে তা এক স্পষ্ট ফ্যাসিস্ট শাসনের নির্দশন। তিনি ১৯ শতকের জরুরি অবস্থার আমলের কথা স্মরণ করে একে নজিরবিহীন স্বৈরাচার বলে অভিহিত করেন। এ সময় দিপকে ও তাঁর সঙ্গীরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দেন এবং পরবর্তীতে পুলিশ তাদের মোবাইল ফোনগুলোও কেড়ে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করার কারণে তাদের আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে দিপকের দাদির মৃত্যুর সংবাদ সামনে আসার পর পুলিশ মানবিক বিবেচনায় তাকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিষয়টি জানায় এবং তার নিজ শহরে যাওয়ার জন্য সহযোগিতার প্রস্তাবও দেয়। তবে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত আটক তিন নেতাকে কোথায় রাখা হয়েছে বা আইনজীবীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সিজেপির পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দলের নেতা অজিঙ্ক্য শিন্দে দিল্লি পুলিশের কমিশনারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে আটক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি এবং তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার জোরালো দাবি জানান।
বিক্ষোভ আন্দোলন পুরোপুরি পণ্ড করতে শনিবার দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। যন্তর-মন্তরমুখী প্রধান সড়ক ও অলিগলিগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দাঙ্গা দমনে ব্যবহৃত বিশেষ সাঁজোয়া যান ও জলকামান মোতায়েন করা হয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয় এবং বাসে উঠে যাত্রীদের পরিচয় ও ভ্রমণের উদ্দেশ্য যাচাই করা হয়। বিক্ষোভে অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষকে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটক করে পুলিশি ভ্যানে করে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় স্টেডিয়ামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, টলস্টয় রোড ধরে যন্তর-মন্তরের মাত্র ৭০০ গজের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলেন গুটিকয়েক বিক্ষোভকারী, তবে মূল বিক্ষোভস্থলে কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে দিল্লি মেট্রোর প্রায় ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রো বন্ধের সময় আরও চার ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত করা হয়। এছাড়া যন্তর-মন্তরের চারপাশের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট সেবাও সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হয়েছিল।
বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর পুলিশি বাধা ও আটকের ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। হিন্দি দৈনিক নবভারত টাইমস এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রল’ ও ‘নিউজলন্ড্রি’র বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আটক করা হলেও পরবর্তীতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিতর্কিত ভূমিকার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে একদল আইনজীবীকেও সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল। পুলিশ সূত্রের বরাতে এএনআই জানায়, আটক ব্যক্তিদের একটি বড় অংশকে পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেওয়া হলেও সিজেপির তিন শীর্ষ নেতাকে তখনো মুক্তি দেওয়া হয়নি এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলে জানানো হয়।
এই বিশাল জনবিক্ষোভ ও উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো ও বিভিন্ন আন্দোলনকারী সংগঠন। তাদের কঠোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) আগামী নির্বাচনগুলোতে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার গভীর চক্রান্ত চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে এই অনিয়ম ও ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে।
সিজেপির পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দলের শীর্ষ নেতাদের বেআইনিভাবে আটক করে বা দমনপীড়ন চালিয়ে এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কোনোভাবেই থামানো যাবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রোববারও যন্তর-মন্তরমুখী বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মসূচি অব্যাহত রাখার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। শনিবারের এই ব্যাপক ধরপাকড় ও বলপ্রয়োগের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রয়টার্সের প্রাথমিক হিসাবে দুই হাজারের বেশি আটকের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে এই সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। রোববারের নতুন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তা ও জনচলাচলে কড়া বিধিনিষেধ বলবৎ রয়েছে এবং আটক নেতাদের মুক্তি ও রোববারের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এখন সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।























