পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) জন্য ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির প্রক্রিয়ায় ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে একটি মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় এই মামলাটি রুজু করা হয়েছে। গত বুধবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহারে যে ৯ জন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাঁরা হলেন—কেএনএফের প্রধান নাথান লনচেও ওরফে নাথান বম (৪৯), মংহলাসিন মারমা ওরফে মং (৩৮), নিয়াজ হায়দার (৩৯), মো. গোলাম আজম (৪৭), সাহেদুল ইসলাম (২৭), মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (৫৮), জামালুল ইসলাম (৪৫), মো. তৌহিদুল ইসলাম (৩৮) এবং মো. মতিউর রহমান (৪৩)।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ জানান যে, এই সমগ্র ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২০২৫ সালের ১৮ মে। ওই দিন রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় আকস্মিক অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক তৈরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত একজনকে আটক করে। পরবর্তীতে আটক ওই ব্যক্তির দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে হালিশহর থানার ছোটপুল এলাকার দুটি ভিন্ন ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করে আরও দুজনকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার অধীন একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানা থেকে কেএনএফের জন্য তৈরি করা মোট ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত এই ইউনিফর্মগুলোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট পোশাক জব্দ করা হয়েছিল, যার প্রতি জোড়া সেটে একটি করে শার্ট ও একটি করে প্যান্ট অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ঘটনার পরপরই বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এরপরই কেএনএফের এই বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির নেপথ্যে জড়িত ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ড ও মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ বা পারচেজ অর্ডার, ব্যবসায়িক পরিচয়পত্র এবং পারস্পরিক আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগের প্রতিটি সূত্র বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন দাপ্তরিক নথি ও সাক্ষীদের জবানবন্দির বরাতে জানা গেছে যে, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা ওরফে মং প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে এবং পরবর্তীতে তাঁর মাধ্যমেই গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের বিশেষ ইউনিফর্মের জন্য নির্দিষ্ট ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক বা কাপড় তৈরির সম্পূর্ণ ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন। অনুসন্ধানে কেএনএফের এই ইউনিফর্ম তৈরির উদ্দেশ্যে ফ্যাব্রিক কেনা এবং পরবর্তী সময়ে পোশাক সেলাই বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ব্যাংক হিসাব, চেক এবং নগদ অর্থের মাধ্যমে এসব অবৈধ লেনদেন সম্পন্ন করা হয় এবং অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য গোপন করার জোরালো অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে সিআইডি নিশ্চিত করেছে।
সিআইডির তদন্তে প্রকাশ পায় যে, মংহলাসিন মারমা নিজেকে ‘এমআই এন্টারপ্রাইজ’-এর সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর এবং ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুটি পৃথক পারচেজ অর্ডার বা ক্রয়াদেশ দাখিল করেছিলেন। এর বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে ফ্যাব্রিক তৈরি বাবদ মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি, কেএনএফের জন্য নির্ধারিত ওই ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের শার্ট ও প্যান্ট সেলাইয়ের কাজের জন্য মংহলাসিন মারমার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন এবং নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিআইডির নিবিড় অনুসন্ধানে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইউনিফর্ম সেলাইয়ের মুজুরি বাবদ আরও ৭২ লাখ টাকা পরিশোধ করার তথ্য পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিতে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা অবৈধভাবে লেনদেন হওয়ার সত্যতা পেয়েছে সিআইডি। যার মধ্যে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় করা হয়েছে ক্যামোফ্লেজ ফ্যাব্রিক বা কাপড় তৈরিতে এবং বাকি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে পোশাক সেলাইয়ের কাজে। এই আর্থিক জালিয়াতি ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঘটনায় গত ৭ অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা নম্বর-১৩ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা হয়েছে। উক্ত মামলায় সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ জোগান প্রদান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে যে, বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম নিবিড়ভাবে চলমান রয়েছে। কেএনএফের এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অর্থের মূল উৎস ও প্রবাহ কোথায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবসহ অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের গভীরে কী রয়েছে, অর্থ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এই বিশাল আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত রয়েছে কি না—তা উদঘাটনে সিআইডির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে আইনি প্রক্রয়ায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত এই অভিযোগগুলোকে বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।


























