যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘায়িত সংঘাত ও যুদ্ধ অষ্টম মাসে গড়ালেও এই ভয়াবহ সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পর্দার অন্তরালে পরোক্ষ আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের সক্রিয় মধ্যস্থতায় এই আলোচনা এবং দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এখনো সচল রয়েছে বলে দোহা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইব্রাহিম আল-হাশিমি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, সংঘাত নিরসনে সংলাপের এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে এবং কাতার ও তাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের কার্যকর সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বার্তা বিনিময় অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এরই মাঝে, ইরানের সামরিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হওয়ার পর দেশটির ভেতরের বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্য এক বক্তব্যে দাবি করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক কে বা কারা ইরান পরিচালনা করছে, তা মার্কিন প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের প্রথম সারির শীর্ষ নেতারা চলে গেছেন এবং দ্বিতীয় সারির নেতারাও নেই; ফলে দেশটি বর্তমানে কাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের তীব্র অনিশ্চয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে, তবে দেশটির জটিল ক্ষমতাকাঠামোয় এই দুই শীর্ষ নেতা বাস্তবে কতখানি স্বাধীনভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
পক্ষান্তরে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই এই মার্কিন উদ্বেগের পাল্টা জবাব দিয়ে এর আগে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের ইরানি প্রতিপক্ষ এবং তেহরানের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত রয়েছেন। তাঁর জোরালো দাবি ছিল যে, বর্তমান সংকটের মূল সমস্যা ইরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোগত দুর্বলতা নয়, বরং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং মিশ্র বার্তা প্রদানের প্রবণতা।
এদিকে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে ইরান সম্প্রতি কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রেরণ করেছিল। ওই কূটনৈতিক প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে পাঠানো ওই প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তা সত্ত্বেও কাতারের মধ্যস্থতা থেমে থাকেনি এবং দোহা সরকারের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদানের ধারা এখনো বজায় রয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে ইরানকে তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা অত্যন্ত ‘অর্থবহ ও দৃশ্যমান’ মাত্রায় কমিয়ে আনতে হবে। ওয়াশিংটন কেবল মৌখিক বা কথার আশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে নারাজ, বরং যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানে তারা তেহরানের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী কার্যকরী পদক্ষেপ দেখতে চায়।























