জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের (ইউএনএইচআরসি) চলমান ৬৩তম অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মানবাধিকারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে প্রথমবারের মতো ‘মানবাধিকার উন্নয়ন ও সুরক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের অত্যন্ত বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সক্রিয় উদ্যোগে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, বাংলাদেশ, মিশর, গ্রিস, গায়ানা, কুয়েত ও নেপালের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ কোর গ্রুপের পক্ষ থেকে মানবাধিকার পরিষদের এই চলমান অধিবেশনে প্রস্তাবটির খসড়া আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর ২০২৬) জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন কর্তৃক প্রেরিত এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য দেশবাসীকে অবহিত করা হয়।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে প্রস্তাবটি এই প্রথম সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়াকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানবাধিকারের দ্রুত বিকাশমান জটিল সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পরিষদের চলমান আলোচনায় একটি সুদূরপ্রসারী মাইলফলক হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই প্রস্তাবটি মূলত একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, ভবিষ্যৎমুখী এবং সম্পূর্ণ মানবাধিকারকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট রয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন মানবজাতির সার্বিক উন্নয়ন ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্লেখযোগ্য অপার সম্ভাবনাকে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে, অন্যদিকে ঠিক তেমনি মানবাধিকারের সার্বিক উন্নয়ন ও সুরক্ষার ওপর এর ক্রমবিকাশমান গভীর প্রভাবগুলোকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে জেনেভাস্থ বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এই প্রস্তাবটির মূল প্রণেতা বা ‘পেন হোল্ডার’ হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। চলতি বছরের ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে কোর গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো মানবাধিকার পরিষদের প্রাক-অধিবেশন সভায় প্রস্তাবটির খসড়া উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেই সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ কোর গ্রুপের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছে এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সঙ্গে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অত্যন্ত গঠনমূলক পরামর্শ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।
মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে প্রস্তাবটির খসড়া আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের সময় বাংলাদেশ অত্যন্ত জোরালোভাবে এই বিষয়টি তুলে ধরে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান বিশ্বে সমাজব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দ্রুত রূপান্তরে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যাপক উন্নয়ন এবং এর বহুমাত্রিক ব্যবহারকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে। একই সঙ্গে মানবিক মর্যাদা এবং মানুষের নিজস্ব স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্তর্নিহিত সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সমগ্র প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখতে হবে বলে বাংলাদেশ অভিমত ব্যক্ত করে।
পাশাপাশি, এই প্রস্তাবটিতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, ফলপ্রসূ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থবহ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রস্তাবটির অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো উদীয়মান ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সুফলগুলো ভোগ করার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান। এতে বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নত কারিগরি সহায়তা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়, প্রযুক্তিতে সহজলভ্য প্রবেশাধিকার এবং সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বাংলাদেশের এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়াকে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জোরালো ভূমিকা এবং বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান যেকোনো বৈশ্বিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।






















