গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তাদের বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সাম্প্রতিক নানামুখী কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এর পরপরই নিষিদ্ধ এসব সংগঠনের সক্রিয় নেতা-কর্মীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশ, পুলিশের নবগঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। একই সঙ্গে সাইবার জগতেও জোরদার করা হয়েছে নিবিড় নজরদারি।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের আকস্মিক ঝটিকা মিছিল আয়োজনের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসে। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি রাজধানী গুলশানের রাস্তায় মিছিল বের করা (যেখান থেকে ৩২ জনকে আটক করা হয়) এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা কেবল সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেনি, বরং দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর যেকোনো অপতৎপরতা নস্যাৎ করতে সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সারাদেশ জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপক বিস্তৃত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। তদুপরি, স্ব স্ব এলাকায় বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ব্যর্থ হলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বদলির মতো কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যম ‘স্ট্রিম’-কে জানান, এসব নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা মূলত অত্যন্ত অপ্রশস্ত বা সরু গলি থেকে বের হয়ে মাত্র আধ মিনিট বা এক মিনিটের জন্য ঝটিকা অবস্থান তৈরি করে। এরপর সেই সংক্ষিপ্ত ভিডিও চিত্র ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালায়। ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এভাবে হঠাৎ গলি থেকে বের হয়ে মুহূর্তে মিলিয়ে যাওয়াকে খুব বড় ধরনের শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে পুলিশ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে উল্লেখ করে এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যোগ করেন, তাদের এসব অপতৎপরতা ভেস্তে দিতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সুযোগসন্ধানীরা যাতে পাড়া-মহল্লার অলিগলি ব্যবহার করে হঠাৎ মিছিল বের করতে না পারে, সেজন্য সারা দেশে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
এসব কর্মকাণ্ডের আর্থিক যোগানদাতাদের বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি জানান, নিষিদ্ধ সংগঠনের সক্রিয় সদস্যদের তালিকা ধরে ধরে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিগত সরকারের সময়ে যারা নানা সুবিধা ভোগ করেছিলেন এবং বর্তমানে গোপনে অর্থ ছড়িয়ে এসব কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, তাদেরকেও চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্তে পেছনের কুশীলবদের খুঁজে বের করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ‘স্ট্রিম’-কে নিশ্চিত করেন যে, এসব সংগঠন যাতে কোনো অবস্থাতেই মাঠে কোনো সভা-সমাবেশ, র্যালি বা অঘোষিত মিছিল সংগঠিত করতে না পারে, সেজন্য প্রতিরোধমূলক গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। দায়িত্বরতদের কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ বা ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে এবং প্রয়োজনে বদলিজনিত প্রশাসনিক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর কার্যালয় কেন্দ্রিক পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) সহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকা উক্ত দলগুলোর প্রোফাইল ও পেজগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ দল হওয়ায় বিচ্ছিন্নভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মতো কিছু জনবল এখনো আওয়ামী লীগের রয়েছে। তবে পুলিশ পেছনের পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। তা ছাড়া অনলাইনে যেকোনো উসকানিমূলক অপপ্রচার রুখতে সাইবার ইউনিটগুলোকে দিনরাত সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিটিআরসি ও এনটিএমসির সহায়তায় উসকানিদাতাদের অবস্থান চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারি অভিযান শুরু হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, পুলিশ ও অন্য তদন্ত সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে মাঠপর্যায়ের সক্রিয় কর্মীদের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
অন্যদিকে, পুলিশের নবগঠিত বিশেষ ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি)-এর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ‘স্ট্রিম’-কে জানান, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতা প্রতিরোধে এসআরবি মূলত দুটি ভিন্ন কৌশলে (প্রোঅ্যাক্টিভ ও রিঅ্যাক্টিভ) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব গোষ্ঠী মূলত অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে নানা ধরনের অপপ্রচার ছড়িয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবক্ষয় ঘটানোর চেষ্টা করে। সে কারণে তাদের সাইবার তৎপরতা অবিরাম মনিটর করা হচ্ছে। রাজপথে নামার আগেই বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের এই প্রক্রিয়াটিকে ‘প্রোঅ্যাক্টিভ’ পদ্ধতি বলা হয়।
রিঅ্যাক্টিভ পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডের আগাম তথ্য পাওয়া মাত্রই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয়, যেন তারা বাইরে আসতে না পারে বা পূর্বঘোষিত স্থানে পৌঁছাতে না পারে। মূলত গোয়েন্দা তথ্য ও সাইবার মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে প্রতিহত করাই হচ্ছে এসআরবির রিঅ্যাক্টিভ কার্যক্রম।


























