ইতালিতে উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে এবং নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার মিথ্যা প্রলোভনে এক প্রবাসীকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় পাচার ও সেখানে আটকে রেখে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জড়িত মানবপাচার চক্রের দুই মূল সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বিমানবন্দর থানার আশকোনা হাজি ক্যাম্পের সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটের সামনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের আটক করা হয়। সিআইডির মিডিয়া বিভাগ থেকে প্রেরિત এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন— মো. আতিকুর রহমান টমাস (৩২) ও মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলাল (৫৪)।
মামলার বিবরণী ও সিআইডির অনুসন্ধানী সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালীর সেনবাগের এক যুবক দীর্ঘ তিন বছর ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। কর্মসংস্থান শেষে দেশে ফেরার পথে বিমানের মধ্যে দুর্ঘটনাবশত এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তির মাধ্যমেই সক্রিয় মানবপাচার চক্রের এই সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে তাকে লিবিয়া হয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ উপায়ে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। এই অবৈধ যাত্রার জন্য সর্বমোট ১২ লাখ টাকার একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়।
পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল ভুক্তভোগী যুবক ঢাকার আশকোনাস্থ চক্রের একটি নির্দিষ্ট কার্যালয়ে নিজের পাসপোর্ট জমা দেন এবং অগ্রিম বাবদ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ প্রদান করেন। এরপর পরিকল্পনা মোতাবেক গত ৭ এপ্রিল তাকে প্রথমে ভারতের নয়াদিল্লি এবং সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পাঠানো হয়। শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১৬ দিন তাকে আটকে রেখে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এবং নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে আরও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে কলম্বো থেকে তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে মিশরের রাজধানী কায়রোতে পাঠানো হয়।
মিশরে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কায়রো বিমানবন্দর থেকে চক্রের অন্য এক সদস্য তাকে একটি অপরিচিত বাসায় নিয়ে টানা পাঁচ দিন বন্দি করে রাখে। এ সময় আগের চুক্তির বাইরেও জোরপূর্বক অতিরিক্ত ৬ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করা হয়। নগদ অর্থ, বিকাশ এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে চক্রটি ভুক্তভোগী যুবক ও তার অসহায় পরিবারের কাছ থেকে সর্বমোট প্রায় ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে।
টাকা পাওয়ার পর মিশর থেকে তাকে গাড়িতে করে অত্যন্ত দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত বেআইনিভাবে পার করে লিবিয়ায় পাচার করা হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর চক্রের স্থানীয় এক সহযোগী তাকে একটি কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রেখে দিনের পর দিন পৈশাচিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই এলাকায় অভিযান চালালে ভুক্তভোগী যুবক অন্যান্য অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে আটক হন এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সে সময়ও পাচারকারীরা তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার কথা বলে পরিবারের কাছে আরও ৬ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।
পরবর্তীতে লিবিয়া পুলিশের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ওই যুবককে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে দীর্ঘ মানসিক ট্রমা কাটিয়ে তিনি নিজেই বাদী হয়ে গত ৫ অক্টোবর বিমানবন্দর থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি সিআইডির বিশেষ টিম তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে। এরপর সফল অভিযানে মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের গ্রেফতারে সিআইডির নিবিড় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


























