ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে অভিযান পরিচালনা করে ইয়েমেনের কৌশলগত উচ্চভূমিগুলো দখলের মাধ্যমে মোকাসহ লোহিত সাগর উপকূলকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী চরম নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে বারবার অনুরোধ জানিয়ে আসলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে সৌদি যুবরাজের নতুন করে করা অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর পূর্ণ প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে বিমান থেকে বোমা নামানোর সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ করেই সেই হামলার নির্দেশ বাতিল করেন। এদিকে গত শনিবার প্রথমবারের মতো রিয়াদে হামলা হওয়ার জোরালো তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার পর হুথিরা সৌদি রাজধানী লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ার কথা স্বীকার করেছে।
অন্যদিকে লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী মোকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় দুই শিশু ও এক নারীসহ মোট ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন বলে হুথি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা সাবা নিশ্চিত করেছে। এই জটিল আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন যে, সৌদি আরবের অনুরোধে সীমিত সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযানে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে ব্রিটেন সম্মত হয়েছে, কারণ তাদের মতে এই পদক্ষেপ বৃহত্তর অঞ্চলকে স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ফ্রান্সের কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে যে, লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবুতে অবস্থিত সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো এবং পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন করিডরের সুরক্ষায় প্যারিসও সার্বিক অবদান রাখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হুথিরা চলতি মাসের শুরুতেই লোহিত সাগর উপকূলের একটি বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে, যার ফলে সরকারি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ইতোমধ্যে অন্তত ৭০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ইয়েমেনি নাগরিক নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ইয়েমেনের পাঁচটি সামরিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে যে, হুথিরা বর্তমানে তাইজ ও লাহিজ প্রদেশের অত্যন্ত কৌশলগত উচ্চভূমি কাহবুব পর্বতমালা দখলের জন্য তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যা লোহিত সাগরের উপকূলকে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মানদেব এলাকা হারানোর পর সরকারি বাহিনী বর্তমানে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে এবং এই পর্বতমালাগুলোই নির্ধারণ করবে যে হুথিরা তাদের সদ্য দখলকৃত এলাকা ধরে রাখতে পারবে কি না কিংবা সরকারি বাহিনী পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হবে কি না। হুথিদের এই লোহিত সাগর উপকূলীয় অগ্রযাত্রার ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশটি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে আসছে এবং এটি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের জন্য নতুন এক কূটনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করেছে।























