বাংলাদেশ ও গণচীন নিজেদের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করা এবং সার্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিধি বহুলাংশে বিস্তৃত করার দৃপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। আজ বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন সফররত চীনের ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী লিউ হাইশিং। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি শাহাদাৎ স্বাধীন গণমাধ্যমের কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
বিশেষ সাক্ষাৎকালে চীনের মহামান্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পাঠানো আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা ও বার্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে পৌঁছে দেন মন্ত্রী লিউ হাইশিং। এর জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) লি ছিয়াংয়ের প্রতি আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান মন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফল বেইজিং সফরের ধারাবাহিকতায় দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের পারস্পরিক দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন আশাব্যঞ্জক দিগন্তের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে চীনের অকৃত্রিম ও শক্ত সমর্থন ভবিষ্যতেও অপরিবর্তিত থাকবে জানিয়ে তিনি বর্তমান সরকারের নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার ওপর গভীর আস্থা প্রকাশ করেন।
দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মহান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশ ও গণচীনের মধ্যকার সুদৃঢ় বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, যা কালক্রমে দুই দেশের সাধারণ জনগণের অন্তরে স্থায়ী ও পরম শ্রদ্ধার জায়গা করে নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী দ্বিপক্ষীয় সেতুবন্ধনকে সযতনে ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা আরও বেশি ফলপ্রসূ করে তোলা বর্তমান সরকারের প্রধানতম প্রশাসনিক অগ্রাধিকার। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়ার সেই ঐতিহাসিক চীন সফরের গভীর অনুপ্রেরণায় সে সময় দেশের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার আমূল রূপান্তরে ঐতিহাসিক ‘খাল খনন বিপ্লব’ সূচনা করা হয়েছিল। ঠিক সেই একই দর্শনের আলোকেই বর্তমান সরকার কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার মহান স্বার্থে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের এক যুগান্তকারী ও প্রাক্কলিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে।
বৈঠকে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) এবং বাংলাদেশের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যকার দলীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও মতবিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধির ওপর উভয় পক্ষ থেকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলকে চীন সরকারের অতিথি হিসেবে বেইজিং সফরের আনুষ্ঠানিক প্রাক-আমন্ত্রণ জানান সফররত মন্ত্রী লিউ হাইশিং। এ ছাড়া বহুল আলোচিত বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং এশিয়ার সর্ববৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের সফলভাবে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বেইজিংয়ের স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ নীতিগত সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতি ও চলাচলের কারণে দেশের জাতীয় অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর যে মারাত্মক সংকট ও চরম চাপ নেমে এসেছে—তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেইজিংয়ের জোরালো কূটনৈতিক সহায়তা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর ইতিবাচক জবাবে রোহিঙ্গা সংকটের ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কথা স্বীকার করে নিয়ে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরাসরি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গোচরে আনার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন চীনা মন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী দলে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও মহান জাতীয় সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম। অপরদিকে চীনা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন ও সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিনসহ ঊর্ধ্বতন একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।






















