মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান তীব্র যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল জ্বালানি পরিবহন রুট ‘হরমুজ প্রণালি’তে নতুন করে গভীর নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, গত রোববার (১ নভেম্বর) কৌশলগত এই প্রণালিতে ঘটা আকস্মিক মাইন বিস্ফোরণের পর দুটি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। তবে এই আকস্মিক বিস্ফোরণের শিকার হওয়া জাহাজ দুটির সঠিক পরিচয়, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ কিংবা কোনো নাবিক হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন ও বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত শুক্রবার কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) বিখ্যাত জাহাজ ‘আল মায়েদা’ অজ্ঞাত কোনো বস্তু থেকে নিক্ষিপ্ত হামলার শিকার হয়েছিল। পরবর্তীতে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি পরিবহন সংস্থা নাকিলাত এক বিবৃতিতে জানায়, ওই হামলায় আল্লাহর অশেষ রহমতে জাহাজের কোনো নাবিক হতাহত হননি এবং সামুদ্রিক পরিবেশেরও কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। তবে এই ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিমত হলো, বাণিজ্যিক জলযান এবং জ্বালানি সরবরাহের মূল ধমণীতে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ও গুরুতর এক হুমকি।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও সমঝোতার চেষ্টা: এদিকে সংকটপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদ ও উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় একটি বিশেষ দুই দিনের কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা চলছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান পরিস্থিতির সুগভীর গুরুত্ব উপলব্ধি করে যেকোনো ধরনের রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের পথ পরিহার করে কূটনীতির শান্ত পথ বেছে নেবে।
তবে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অনাস্থা দূর করতে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এসব স্পর্শকাতর ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে পাহাড়সম মতপার্থক্য রয়ে গেছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে যদি দ্রুত কোনো গ্রহণযোগ্য সমঝোতা না হয়, তবে দেশটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব: উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য নৌপথ। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বিশাল ও উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিতভাবে এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে এই জলপথে যদি জাহাজ চলাচল দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জাহাজের বিমা খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানিকারক দেশগুলোর পণ্য আমদানি ব্যয়ও বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমদানিনির্ভর উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই আকস্মিক ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে। বাংলাদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে জ্বালানি তেল আমদানির বাড়তি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত ও মারাত্মক চাপ তৈরি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে তীব্র অনিশ্চয়তা বিরাজ করা সত্ত্বেও কূটনৈতিক অগ্রগতির কিছু ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পেয়ে গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সাময়িকভাবে কিছুটা কমেছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে যদি নতুন করে কোনো ট্যাংকারে হামলা হয় কিংবা সামরিক উত্তেজনা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তবে বিশ্ববাজারে আবারও চরম অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এই সংকটের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। যদি শেষ পর্যন্ত এই আলোচনায় কোনো কার্যকর সমঝোতা না আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক মহাবিপর্যয় ও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।























