গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত বৈষম্যবিরোধী গণ-আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার চূড়ান্ত রায় আগামী বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঘোষণা করা হবে।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর সম্মানিত চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্য বিশিষ্ট বিচারিক প্যানেল উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রায়ের জন্য এই সুনির্দিষ্ট দিন ধার্য করেন।
আলোচিত এই মামলার অপর তিন অভিযুক্ত আসামি হলেন—কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।
মামলার অভিযুক্ত চারজন আসামির সকলেই বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে পলাতক থাকায় তাঁদের পক্ষে বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী আমির হোসেন আদালতে আইনি লড়াই ও যুক্তিতর্ক সম্পাদন করেন।
আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের (প্রসিকিউশন) পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, জহিরুল আমিন এবং সহিদুল ইসলাম সরদার।
এর পূর্বে গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের সমাপনী যুক্তিতর্ক এবং পাল্টা যুক্তি খণ্ডনপ্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হওয়ার পর আদালত মামলাটি চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিলেন। তারও আগে গত ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে অভিযুক্ত চার আসামিরই অপরাধের তীব্রতা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ শাস্তির জোর দাবি জানানো হয়েছিল।
মামলা ও যুক্তিতর্ক প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, “ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবউল আলম হানিফ। তখনকার আন্দোলন কঠোরভাবে দমনে তৎকালীন সরকারের নেওয়া প্রতিটি নীতিগত ও নির্দেশনামূলক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। একজন প্রভাবশালী বেসামরিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি অধীনস্তদের ব্যবহার করে রাজপথে এসব হত্যাযজ্ঞ বাস্তবায়ন করিয়েছেন। কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় সশস্ত্র নেতাকর্মীদের মুঠোফোনে সরাসরি হত্যাযজ্ঞ চালানোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি, যার অকাট্য অডিও রেকর্ড ইতিমধ্যে ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করে বলেন, একই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাসীন দলটির একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় সমপর্যায়ের অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হানিফসহ এই চার আসামির বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
ট্রাইব্যুনালের মামলার নথি ও বিবরণ অনুযায়ী, গত বছরের ২ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ৬ অক্টোবর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রটি (ফরমাল চার্জ) আদালত আমলে নেন।
পুরো মামলা চলাকালে মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। একপর্যায়ে গত ১০ জুন চূড়ান্ত যুক্তি খণ্ডন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হলেও রাষ্ট্রপক্ষ নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ আদালতে দাখিল করায় ট্রাইব্যুনাল পুনরায় উভয়পক্ষের সম্পূরক যুক্তিতর্ক গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, অভিযুক্ত এসব আসামিদের বিরুদ্ধে গত জুলাই আন্দোলন চলাকালে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, সহিংস ষড়যন্ত্র এবং কুষ্টিয়া জেলায় পৃথক হামলায় ছয়জনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।


























