তামাকজনিত বিভিন্ন মরণব্যাধি রোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। একই সঙ্গে তামাক ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্যসেবাবাবদ অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি এবং সার্বিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়াসহ দেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেকোনো মূল্যে কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দীন।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) সকালে রাজধানী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের উদ্যোগে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২৬ ও পরবর্তী করণীয়’ শীর্ষক আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দীন তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে, অসংক্রামক রোগসমূহ নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে কঠোরভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিনের মরণনেশা ও আসক্তি থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট এবং ফলপ্রসূ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তামাকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো, তরুণ সমাজকে রক্ষা করা এবং জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সব ধরনের প্রয়োজনীয় আইনগত ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে তাঁর জোরালো সমর্থনের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
উক্ত সভায় উপস্থিত দেশের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাক নিয়ন্ত্রণকর্মীরা অবিলম্বে ‘সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২৬’ দ্রুত বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি এর অনুকূলে প্রয়োজনীয় বিধিমালা অবিলম্বে প্রণয়নের জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া ই-সিগারেটসহ সব ধরনের নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও প্রকাশ্য বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার জোরালো আহ্বান জানান তারা।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) এবং তামাকের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত বিদ্যমান বিভিন্ন গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বক্তারা জানান যে, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করে আসছেন। এর ফলে তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে, যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৪৬ জন মানুষ তামাকের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, তামাক ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা বাবদ স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল মানুষের জনস্বাস্থ্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই উল্লেখ করে বক্তারা আরও বলেন যে, নির্বিচারে তামাক চাষের কারণে দেশের সবুজ বনভূমি উজাড় হচ্ছে, মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সভায় সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২৬-এ ই-সিগারেট ও অন্যান্য নতুন নিকোটিনজাত পণ্যগুলো সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বক্তারা গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন লোভনীয় ও আকর্ষণীয় বিপণন কৌশলের মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্মকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে এসব আধুনিক নিকোটিন পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ করে চলেছে, যার ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিকোটিনে আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি ভয়াবহ মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বক্তারা তথ্য দিয়ে জানান যে, ইতিমধ্যে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশেও অবিলম্বে ই-সিগারেটসহ নতুন সকল নিকোটিনজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তারা। পাশাপাশি এসব ক্ষতিকর পণ্যের ব্যাপক প্রচার এবং সহজলভ্যতা চিরতরে বন্ধ করতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক আখতার-উজ-জামান। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের উপপরিচালক মোখলেছুর রহমান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একই মিশনের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন, বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোকাদ্দেম হোসেন এবং বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপুসহ ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ইয়ুথ ফোরামের তরুণ সদস্যরা।






















