Dhaka ১০:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

ফ্যামিলি কার্ডে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারে: বিশ্বব্যাংক

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৩:৪৭:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৯ বার দেখা হয়েছে

একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একটি একক কাঠামোর আওতায় একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও উন্নত ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে সফলভাবে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ও লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রখ্যাত প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির ফলেই বহিঃখাত এই স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। তবে এর বিপরীতে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, চলমান জ্বালানি সংকট, অত্যন্ত কম রাজস্ব আদায় এবং সামগ্রিক বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে এক গভীর চাপের মুখে পড়েছে। এমতাবস্থায় উদ্ভূত পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দিতে দেশের ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত, সাহসী ও কার্যকর সংস্কার সাধনের জোরালো তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির যদি ক্রমান্বয়ে উন্নতি ঘটে এবং সরকারের পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রমগুলো যথাযথ গতি পায়, তবে আগামী ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমান্বয়ে শ্লথ হয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বিভিন্ন দুর্বলতার সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ কমে গেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

বিশেষ করে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা বর্তমান অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে ঠেকেছে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম সর্বনিম্ন। এর ফলে সরকারের হাতে দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ও সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ বাজেট ঘাটতিও ২০২৫ অর্থবছরের জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

অর্থনীতির এই বহুমাত্রিক দুর্বলতার সরাসরি এবং কঠোর প্রভাব পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থমকে গেছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাবে বিশেষ করে নারী সমাজ তাদের চাকরি হারিয়ে কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের পরিচালক জ্যঁ পেসমে মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির টেকসই ধারায় ফিরে আসতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে অবিলম্বে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া এবং নতুন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বার্থে এই সংস্কারগুলো অবধারিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে সহায়তা করে আসছে বলে স্বীকার করা হলেও, বিশ্বব্যাংকের বিশদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এখনো দেশের কোনো না কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। ফলে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও আধুনিক ও নির্ভুল করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চাভিলাষী ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’র দ্রুত বাস্তবায়ন ও এর ব্যাপক সম্প্রসারণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই পুরোপুরি তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ উপায়ে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে নিয়মিত কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে দূর করা। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বহুগুণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সাধন করা না গেলে দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এছাড়া, একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, চলতি বছর গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে, যা ২০২৭ সালে সামান্য কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। এ সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করার জোরালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

ফ্যামিলি কার্ডে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারে: বিশ্বব্যাংক

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৩:৪৭:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একটি একক কাঠামোর আওতায় একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও উন্নত ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে সফলভাবে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ও লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রখ্যাত প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির ফলেই বহিঃখাত এই স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। তবে এর বিপরীতে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, চলমান জ্বালানি সংকট, অত্যন্ত কম রাজস্ব আদায় এবং সামগ্রিক বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে এক গভীর চাপের মুখে পড়েছে। এমতাবস্থায় উদ্ভূত পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দিতে দেশের ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত, সাহসী ও কার্যকর সংস্কার সাধনের জোরালো তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির যদি ক্রমান্বয়ে উন্নতি ঘটে এবং সরকারের পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রমগুলো যথাযথ গতি পায়, তবে আগামী ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমান্বয়ে শ্লথ হয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বিভিন্ন দুর্বলতার সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ কমে গেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

বিশেষ করে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা বর্তমান অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে ঠেকেছে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম সর্বনিম্ন। এর ফলে সরকারের হাতে দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ও সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ বাজেট ঘাটতিও ২০২৫ অর্থবছরের জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

অর্থনীতির এই বহুমাত্রিক দুর্বলতার সরাসরি এবং কঠোর প্রভাব পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থমকে গেছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাবে বিশেষ করে নারী সমাজ তাদের চাকরি হারিয়ে কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের পরিচালক জ্যঁ পেসমে মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির টেকসই ধারায় ফিরে আসতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে অবিলম্বে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া এবং নতুন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বার্থে এই সংস্কারগুলো অবধারিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে সহায়তা করে আসছে বলে স্বীকার করা হলেও, বিশ্বব্যাংকের বিশদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এখনো দেশের কোনো না কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। ফলে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও আধুনিক ও নির্ভুল করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চাভিলাষী ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’র দ্রুত বাস্তবায়ন ও এর ব্যাপক সম্প্রসারণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই পুরোপুরি তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ উপায়ে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে নিয়মিত কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে দূর করা। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বহুগুণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সাধন করা না গেলে দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এছাড়া, একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, চলতি বছর গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে, যা ২০২৭ সালে সামান্য কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। এ সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করার জোরালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।