বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা কাটিয়ে গতি ফেরাতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী কাঠামোগত সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থার সর্বশেষ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত ২০২৩ সাল থেকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমেই মন্থর হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের ব্যাপক ঝুঁকি এবং অত্যন্ত দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় সামগ্রিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ ও আগামী ২০২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটলে এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি আসলে ২০২৮ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। বর্তমানে দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং ব্যবসার খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর বিপরীতে শক্তিশালী প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক এই মন্দার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের জনমিতি ও শ্রমবাজারে। ২০২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বাভাবিক গতি থমকে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে এবং অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। একই সময়ে আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে আটকে রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বনিম্ন হার হিসেবে বিবেচিত। এর ফলে জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তীব্রভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলোও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক অংশই এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনতে এবং সঠিক মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছাতে বিশ্বব্যাংক সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যক্রম দ্রুত কার্যকর ও সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছে। খাদ্য ভর্তুকি সংক্রান্ত একাধিক কর্মসূচি একীভূত করে পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা প্রদানের পরিধি বাড়ালে অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের কবল থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের পরিচালক জ্যাঁ পেসমে এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোরগুলোর সম্ভাবনা পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অবকাঠামো তৈরির ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

























