Dhaka ০৭:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৯:০২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৮ বার দেখা হয়েছে

আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আমূল রূপান্তর ঘটবে এবং এর চেহারা পুরোপুরি বদলে যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালনার দিন এখন শেষ।

রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নীতিনির্ধারণী কথা বলেন। বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের এবারের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা ও প্রতারণা সতর্কতা’।

বিশেষ উদ্বোধনী ভাষণে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার, পাবলিক ফাইন্যান্স আর্কিটেকচার এবং প্রাইভেট সেক্টরের ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিবর্তন করছি। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা আইএমএফ টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাবো—এই মানসিকতা ও প্রথা আর থাকবে না।”

উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থের সার্বিক ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) কমাতে হবে। ফান্ডের কস্ট হ্রাস করতে না পারলে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে দেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বিকল্প অর্থায়নের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।” দেশের বড় বড় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্জিত সম্পদ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আয়কে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মূলধন সংগ্রহের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু এবং যমুনা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পের সিকিউরিটাইজেশনের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে বিনিয়োগের এমন বিপুল সম্ভাবনাময় সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার জাতীয় রূপকল্প তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, এই বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনে কেবল আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বার্ষিক ক্ষুদ্র অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি বাতিলের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সরাসরি বলেন, “আইএমএফ টাকা দেবে, বিশ্বব্যাংক টাকা দেবে—এ কথা ভুলে যান। আপনারা দেখেছেন, আমি ইতোমধ্যে আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি। কারণ তাদের দেওয়া অন্যায্য শর্তাবলী আমাদের দেশের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আরও যোগ করেন, “আই অ্যাম গোয়িং টু দ্য মার্কেট, আই অ্যাম গোয়িং টু গেট মাই মানি। আইএমএফ ও উন্নয়ন সহযোগীরা যে টাকা দেবে, তা দিয়ে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব নয়। আমার প্রতি বছর লক্ষ্য পূরণে ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। আর তোমরা সব সংস্থা মিলে বছরে দেবে সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলার, এর জন্য অপেক্ষা করার সময় আমার নেই। আমরা উন্মুক্ত বাজার থেকে খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি।”

দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আগামী এক বছরের মধ্যে ‘ফেইস অব বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট উইল বি চেইঞ্জড’। কোনো বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটলে এই পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই আসবে।”

এদিকে শেয়ারবাজারসহ গোটা আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বা আদেশের জন্য মুখাপেক্ষী না থেকে নিজস্ব কার্যালয়ে ‘স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ (Self-regulation) গড়ে তোলার আহ্বান জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও আইনি দায়িত্ব বুঝতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসে কী করতে হবে বা কী করা যাবে না তা প্রতিনিয়ত বলে দেবে—এমন অলস অপেক্ষায় থাকা চলবে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজেদের কাজের নীতিগত ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক খাতের মূল স্থায়িত্ব বহুলাংশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিখুঁত হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদনের (Financial Statement) ওপর নির্ভর করে। তাই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক সফলতা ও কার্যকারিতা বোঝাতে অর্থমন্ত্রী নিজের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী থাকার সময়ের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, তৎকালীন সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির হিসাবসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ইউডি (Utilisation Declaration) সনদ নিতে হতো সরকারি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে। সে সময় ইপিবি থেকে এই সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পদে পদে ব্যবসায়ীদের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক অনিয়মের মুখোমুখি হতে হতো, যা তৈরি পোশাক বিদেশে শিপমেন্টের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত।

তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইপিবির আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পেছনে সময় নষ্ট না করে ওই ইউডি সনদ প্রদানের পূর্ণ দায়িত্ব পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর কাছে হস্তান্তরের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল, বিজিএমইএকে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। শুরুতে বিজিএমইএর প্রতিনিধিরা এই বিশাল দায়িত্ব নিতে কিছুটা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হলেও পরবর্তীতে তারা স্বনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সফলভাবে গ্রহণ করে। এরপর থেকে দীর্ঘ দিন ধরে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে এই ব্যবস্থা সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী এই উদাহরণ টেনে স্পষ্ট বলেন, “প্রত্যেক মানুষের যেমন স্বনিয়ন্ত্রণ করতে শেখা উচিত, তেমনই প্রতিটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানেরও নিজেদের স্বনিয়ন্ত্রণ করতে শেখা উচিত।নিয়ন্ত্রকের নির্দেশের জন্য অহেতুক অপেক্ষা করবেন না।” সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন ও স্বনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারলে বর্তমান সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সংস্কার ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জিত হবে।

উক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৯:০২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আমূল রূপান্তর ঘটবে এবং এর চেহারা পুরোপুরি বদলে যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালনার দিন এখন শেষ।

রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নীতিনির্ধারণী কথা বলেন। বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের এবারের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা ও প্রতারণা সতর্কতা’।

বিশেষ উদ্বোধনী ভাষণে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার, পাবলিক ফাইন্যান্স আর্কিটেকচার এবং প্রাইভেট সেক্টরের ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিবর্তন করছি। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা আইএমএফ টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাবো—এই মানসিকতা ও প্রথা আর থাকবে না।”

উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থের সার্বিক ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) কমাতে হবে। ফান্ডের কস্ট হ্রাস করতে না পারলে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে দেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বিকল্প অর্থায়নের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।” দেশের বড় বড় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্জিত সম্পদ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আয়কে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মূলধন সংগ্রহের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে পদ্মা সেতু এবং যমুনা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পের সিকিউরিটাইজেশনের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে বিনিয়োগের এমন বিপুল সম্ভাবনাময় সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার জাতীয় রূপকল্প তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, এই বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনে কেবল আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বার্ষিক ক্ষুদ্র অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি বাতিলের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সরাসরি বলেন, “আইএমএফ টাকা দেবে, বিশ্বব্যাংক টাকা দেবে—এ কথা ভুলে যান। আপনারা দেখেছেন, আমি ইতোমধ্যে আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি। কারণ তাদের দেওয়া অন্যায্য শর্তাবলী আমাদের দেশের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে আরও যোগ করেন, “আই অ্যাম গোয়িং টু দ্য মার্কেট, আই অ্যাম গোয়িং টু গেট মাই মানি। আইএমএফ ও উন্নয়ন সহযোগীরা যে টাকা দেবে, তা দিয়ে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব নয়। আমার প্রতি বছর লক্ষ্য পূরণে ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। আর তোমরা সব সংস্থা মিলে বছরে দেবে সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলার, এর জন্য অপেক্ষা করার সময় আমার নেই। আমরা উন্মুক্ত বাজার থেকে খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি।”

দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আগামী এক বছরের মধ্যে ‘ফেইস অব বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট উইল বি চেইঞ্জড’। কোনো বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটলে এই পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই আসবে।”

এদিকে শেয়ারবাজারসহ গোটা আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বা আদেশের জন্য মুখাপেক্ষী না থেকে নিজস্ব কার্যালয়ে ‘স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ (Self-regulation) গড়ে তোলার আহ্বান জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও আইনি দায়িত্ব বুঝতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসে কী করতে হবে বা কী করা যাবে না তা প্রতিনিয়ত বলে দেবে—এমন অলস অপেক্ষায় থাকা চলবে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজেদের কাজের নীতিগত ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক খাতের মূল স্থায়িত্ব বহুলাংশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিখুঁত হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদনের (Financial Statement) ওপর নির্ভর করে। তাই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক সফলতা ও কার্যকারিতা বোঝাতে অর্থমন্ত্রী নিজের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী থাকার সময়ের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, তৎকালীন সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির হিসাবসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ইউডি (Utilisation Declaration) সনদ নিতে হতো সরকারি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে। সে সময় ইপিবি থেকে এই সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পদে পদে ব্যবসায়ীদের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক অনিয়মের মুখোমুখি হতে হতো, যা তৈরি পোশাক বিদেশে শিপমেন্টের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত।

তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইপিবির আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পেছনে সময় নষ্ট না করে ওই ইউডি সনদ প্রদানের পূর্ণ দায়িত্ব পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর কাছে হস্তান্তরের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল, বিজিএমইএকে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। শুরুতে বিজিএমইএর প্রতিনিধিরা এই বিশাল দায়িত্ব নিতে কিছুটা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হলেও পরবর্তীতে তারা স্বনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সফলভাবে গ্রহণ করে। এরপর থেকে দীর্ঘ দিন ধরে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে এই ব্যবস্থা সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী এই উদাহরণ টেনে স্পষ্ট বলেন, “প্রত্যেক মানুষের যেমন স্বনিয়ন্ত্রণ করতে শেখা উচিত, তেমনই প্রতিটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানেরও নিজেদের স্বনিয়ন্ত্রণ করতে শেখা উচিত।নিয়ন্ত্রকের নির্দেশের জন্য অহেতুক অপেক্ষা করবেন না।” সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন ও স্বনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারলে বর্তমান সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সংস্কার ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জিত হবে।

উক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।