আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরকারি ও বেসরকারি নানা মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সার সংগ্রহের একাধিক প্রস্তাবে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রদান করেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি, মরক্কো থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি এবং বেসরকারি আমদানিকারক এজেন্সির মাধ্যমে ৫ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি, ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি ও ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানি করা হবে। এসব সার সংগ্রহে জাতীয় রাজস্ব থেকে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান ‘সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি’ থেকে ১০ শতাংশ কম-বেশিসহ মোট ৪০ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার ক্রয়ের অনুমোদনে সায় দিয়েছে সরকার। এই নির্দিষ্ট চালানটির জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসব কেনাকাটার সিংহভাগ বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চাহিদার ভিত্তিতে সৌদি আরব থেকে উক্ত ইউরিয়া সার আনা হবে, যার চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করা হবে সরকারের কৃষি ভর্তুকি খাতের নির্ধারিত বরাদ্দ থেকে। বৈঠকের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে জিটুজি বা সরকার-টু-সরকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে সৌদি সাবিক থেকে নিয়মিত ইউরিয়া কেনা হচ্ছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মোট ৮ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চুক্তি বিদ্যমান, যার মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার টন নির্ধারিত এবং জরুরি চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ৫ লাখ টন সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। চুক্তির শর্ত ও আন্তর্জাতিক মূল্যসূচক মেনে পঞ্চম লটে প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ার দাম ধরা হয়েছে ৩৯১.৬৬ মার্কিন ডলার। এতে মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার বা ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা।
অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন (প্রডিনটর্গ)’-এর সঙ্গে জিটুজি চুক্তির আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ষষ্ঠ লটে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আমদানির প্রস্তাব পাস হয়েছে। ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৩ হাজার মার্কিন ডলার বা ১৬৬ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ৪৫০ টাকা ব্যয়ে এই সার কেনা হবে, যেখানে প্রতি মেট্রিক টনের দাম পড়বে ৩৮৩.৮০ মার্কিন ডলার। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কমিটির নীতিগত অনুমোদনের পর গত ২৪ মে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিএডিসির ৭ লাখ ১৬ হাজার টন এমওপি সার কেনার লক্ষ্যের মধ্যে রাশিয়া থেকেই আনা হবে ৫ লাখ ৯৫ হাজার টন, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন দেশে এসে পৌঁছেছে।
একই বৈঠকে মরক্কোর ‘ওসিপি নিউট্রিক্রপস এসএ’ এবং বিএডিসির মধ্যে চুক্তি অনুসারে ৩য় ও ৪থ পৃথক দুটি ঐচ্ছিক লটে মোট ৮০ হাজার টন (প্রতি লটে ৪০ হাজার টন করে) ডিএপি সার সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উভয় লটেই প্রতি মেট্রিক টন সারের দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮৫ মার্কিন ডলার এবং প্রতিটি লটের মোট ক্রয়মূল্য ৪৩৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
সরকারি কেনাকাটার বাইরেও বেসরকারি ২০টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মরক্কো, রাশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিশর ও তিউনেশিয়া থেকে ৫ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ৯৩৮ ডলার হিসাবে এতে মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। আমদানিকারকদের তালিকায় এনআরকে হোল্ডিং, দেশ ট্রেডিং করপোরেশন, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মুগ্ধ ট্রেডার্স, বাস্ক ট্রেড, মেসার্স আকন এন্টারপ্রাইজ, সান সাইনিং লিমিটেড, মেসার্স দীপা এন্টারপ্রাইজ, মৌনতা ট্রেড, নোয়াপাড়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স ফারিহা ট্রেডিং, ফাইয়াজ ট্রেড, নোয়াপাড়া ট্রেডিং, সাইফুল্লাহ তাকওয়া, তাইবা সাইফুল্লাহ, সুফলা ট্রেডিং, সাইফুল্লাহ গালফ ও ফাইয়াজ ট্রেডিং করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ১০ হাজার থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত সার নিয়ে আসবে।
একইভাবে বেসরকারি ১৪টি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়া, কানাডা ও বেলারুশ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আনার প্রস্তাবে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ৩৯৮.৯৭ মার্কিন ডলার হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় ব্যয় হবে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার। বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স আকন এন্টারপ্রাইজ, এনআরকে হোল্ডিং, দেশ ট্রেডিং, নীপা এন্টারপ্রাইজ, মুগ্ধ ট্রেডার্স, মৌনতা ট্রেড, নোয়াপাড়া ট্রেড, আলিফ ট্রেডিং, তাইবা সাইফুল্লাহ, সাইফুল্লাহ গালফ ও সাইফুল্লাহ তাকওয়াসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন করে সার সরবরাহ করবে।
পরিশেষে, ১০টি বেসরকারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেবানন, বুলগেরিয়া, মরক্কো, মিশর ও তিউনেশিয়া থেকে ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন সারের মূল্য ৭৫৬ মার্কিন ডলার ধরে এর মোট ক্রয়মূল্য দাঁড়াবে ১৫ কোটি ১২ লাখ মার্কিন ডলার। মেসার্স রত্না এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেডিং, দেশ ট্রেডিং, এনআরকে হোল্ডিং, বাল্ক ট্রেড, নোয়াপাড়া ট্রেডার্স, সাইফুল্লাহ তাকওয়া ও সুফলা ট্রেডিং করপোরেশনসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠানভেদে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত টিএসপি সার বাংলাদেশে আমদানি করার অনুমতি পেয়েছে।


























