কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কর্মহীনতা ও জীবিকার সুযোগের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে অনলাইনে জুয়ার নেশা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে তরুণ শরণার্থীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে বিপুল পরিমাণ দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়া এবং সেই ঋণ শোধের তাগিদে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যে এই উদ্বেজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন ও সশস্ত্র গ্রুপে যোগদানসহ ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর আগে প্রথম প্রান্তিকজুড়েও অনুরূপ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শত শত শরণার্থী। বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত জায়গার মধ্যে কর্মক্ষম বিপুল যুবসমাজের অলস বসে থাকা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাই তাদের এমন ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে অনেকের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়, যার দৃষ্টান্ত মিলছে সাধারণ শরণার্থীদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কর্মকর্তারা জানান, ক্যাম্পে সংঘটিত অপহরণের ঘটনার প্রায় ৯৫ শতাংশই স্বেচ্ছায় বা জুয়ার দেনার দায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজানো নাটক। জুয়ায় টাকা হারিয়ে পরিবার বা আত্মীয়দের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য তারা এই পথ বেছে নেন। তবে অপরাধ দমনে কিছু প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে অপরাধীরা ভিপিএন ব্যবহার করায়, অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করায় এবং ক্যাম্পের ভেতরের জুয়ার টাকা বা লেনদেন চট্টগ্রামসহ বাইরে ক্যাশআউট করায় তা কঠোরভাবে মনিটর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এপিবিএন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতময় পরিবেশ থেকে উঠে আসা এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধের মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারত, তবে সার্বিক সমন্বিত পদক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, অলস যুবকদের অপরাধ ও অনলাইন জুয়া থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সহায়তায় ক্যাম্পের কিছু এলাকায় লাইব্রেরি ও সহশিক্ষামূলক কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যা তাদের ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখতে কিছুটা হলেও সহায়তা করছে।


























