Dhaka ০১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

সাজেক সড়কে ষষ্ঠ দিনের মতো অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, স্থবির পর্যটন খাত

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:১১:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার দেখা হয়েছে

রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বিশ্বখ্যাত সাজেক সড়কে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো অনির্দিষ্টকালের কঠোর সড়ক অবরোধ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এই আকস্মিক অবরোধের কারণে দেশের অন্যতম প্রধান ভ্রমণকাক্সিক্ষত পর্যটন কেন্দ্র সাজেকের সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সাথে স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে কোনো কার্যকর সমঝোতা হয়নি। বৈঠকটি ব্যর্থ হওয়ায় অবরুদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলন পরিচালনাকারী দুই প্রভাবশালী স্থানীয় সংগঠন—‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং ‘সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন’। এই অচলাবস্থার কারণে দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন উপত্যকা সাজেক ভ্যালিতে সার্বিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র মানসিক উদ্বেগ ও আর্থিক দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাজেক অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা সমর্থিত চিহ্নিত সশস্ত্র সদস্যদের দ্রুত অপসারণ করা এবং চলমান আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা। সুনির্দিষ্ট এসব যৌক্তিক দাবি নিয়ে স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে একাধিকবার প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত বর্তমান সংকট নিরসনে কোনো স্থায়ী ও দৃশ্যমান ইতিবাচক সমাধান বের হয়ে আসেনি।

বৈঠকেও মেলেনি সুনির্দিষ্ট সমাধান

গতকাল সোমবার বেলা শেষের দিকে সাজেকের উজোবাজার এলাকায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সরকারি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সাথে আন্দোলনকারীদের এক বিশেষ সংলাপ ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাজেক অঞ্চল থেকে সন্তু লারমা সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া ও নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। পরবর্তীতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, দাবিসমূহ পূরণ ও কার্যকর কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই অনড় সড়ক অবরোধ পূর্ণাঙ্গভাবে অব্যাহত থাকবে।

এর পূর্বে সাজেকসহ সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্ভূত সংঘাতময় ও অস্থির পরিস্থিতি নিরসনে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে নিবিড় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি আসনের জাতীয় সংসদ সদস্যরা। গত ২৫ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে আয়োজিত দুই জেলার হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে শীর্ষ প্রশাসনের বিশেষ বৈঠকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করার উদ্দেশ্যে তিন সদস্যের একটি সুনির্দিষ্ট কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সরকারি এসব উদ্যোগের পরও বাস্তব মাঠপর্যায়ে সংকট মোচনে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

সম্পূর্ণ বন্ধ যানবাহন চলাচল, চরম পর্যটকশূন্য সাজেক

ধারাবাহিক অবরুদ্ধ কর্মসূচির কারণে সাজেক সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পর্যটকদের স্বাভাবিক যাতায়াত ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে গত ২২ অক্টোবর সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থার অধীনে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ সহায়তায় সাজেকে অবস্থানরত প্রায় তিন হাজার আটকে পড়া পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ির দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। উক্ত পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই মূলত সাজেকের সমস্ত রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক ভ্রমণ কার্যক্রম পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, গত ১১ অক্টোবরও একই ধরনের সড়ক অবরোধের দরুন সাজেকে পর্যটকদের প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অচলাবস্থা ও বৈরী সংকট তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে পবিত্র দুর্গাপূজার ছুটি উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সাময়িকভাবে অবরোধ শিথিল রাখা হলেও ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় দ্বিতীয় দফায় নতুন করে কঠোর অবরোধ শুরু হয়। ফলে খুব স্বল্প সময়ের জন্য পর্যটন কার্যক্রম চালুর মুখ দেখলেও আবারও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে সাজেক।

সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব

সাজেক ভ্যালির সার্বিক অর্থনীতি মূলত এখানকার দৃষ্টিনন্দন রিসোর্ট-কটেজ, নিজস্ব পরিবহন খাত, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ক্ষুদ্র দোকানপাট এবং হরেক রকম পর্যটকসেবার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অনাকাঙ্ক্ষিত এই অবরোধের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন সম্পূর্ণ থমকে যাওয়ায় এসব খাতের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটক না থাকায় সাজেকের কটেজ ও রিসোর্টগুলোর অগ্রিম বুকিং বাতিল হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী ‘চাঁদের গাড়ি’ ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ পরিবহন অচল হয়ে পড়েছে এবং খাবারের দোকান ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন আয় শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

অবরোধ শুরু হওয়ার আগে দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি ও পর্যটন মৌসুমের শুরুকে কেন্দ্র করে সাজেকের প্রায় সকল রিসোর্ট ও কটেজে শতভাগ অগ্রিম বুকিং নিশ্চিত ছিল বলে জানিয়েছিলেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু নতুন করে অবরোধ ও প্রশাসনের নিরাপত্তাজনিত নানা বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকরা বাধ্য হয়ে নিজেদের ভ্রমণ বাতিল বা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করায় কটেজ মালিকরা বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কটেজের কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ, পরিবহন পরিচালনা ব্যয় মেটানো এবং ব্যাংক বা এনজিওর ঋণের কিস্তি প্রদান নিয়ে মারাত্মক সংকট দেখা দেবে।

এর আগে পর্যটন স্থবির হয়ে পড়ার কারণে সাজেকের পর্যটন ও পরিবহন খাতে কোটি কোটি টাকার অপূরণীয় ব্যবসায়িক ক্ষতির তথ্য জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা। দীর্ঘায়িত এই অবরোধের ফলে চলমান ক্ষতির পরিমাণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে গভীর শঙ্কায় রয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সাজেকের অন্যতম জনপ্রিয় ‘রুইলুই রিসোর্ট’-এর পরিচালক মিশু দে এ প্রসঙ্গে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অনাকাঙ্ক্ষিত অবরোধ ও প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞার কারণে সম্পূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রটি আপাতত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ভ্রমণের মূল পর্যটন মৌসুমের একদম শুরুতেই এমন অভূতপূর্ব অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, রিসোর্ট কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। উদ্ভূত প্রশাসনিক ও সামাজিক সংকটের দ্রুত সমাধান না করা হলে এই বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় স্থানীয় জনসাধারণ

সাজেক উপত্যকার বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে একদিকে আন্দোলনকারীরা নিজেদের পেশাগত ও সামাজিক সুরক্ষাসহ মূল দাবিগুলো পূরণের জোরালো নিশ্চয়তা দাবি করছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন। প্রধান সড়ক যোগাযোগ অবরুদ্ধ থাকায় সাজেকের পর্যটন খাতের পাশাপাশি স্থানীয়দের স্বাভাবিক কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনের তরফ থেকে দফায় দফায় আলোচনা ও সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও গতকালের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কোনো ইতিবাচক সমঝোতা না হওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতির আশু সমাধান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পর্যটন খাতের অপূরণীয় ক্ষতি রোধ করতে এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সকল পক্ষকে নিয়ে একটি সময়োপযোগী ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি বলে তাগিদ দিচ্ছেন অভিজ্ঞ মহল।

সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বর্তমান ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আমাদের সাজেকে প্রায় ১৩০টির মতো রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, যার প্রতিটিই এখন পুরোপুরি পর্যটকশূন্য ও ফাঁকা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর পাশাপাশি এখানকার স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, চায়ের স্টল, মুদির দোকান, ফুডকোর্ট এবং ভাসমান হকারসহ বিভিন্ন পেশার শত শত মানুষ কর্মহীন হয়ে বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। একই সাথে সাজেকের পাহাড়ি মানুষের উৎপাদিত নানা ধরনের ফলমূল ও জুমের তরতাজা ফসল বাজারজাত করতে না পারায় তা পচে নষ্ট হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সাজেক এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর এক ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। আমরা দ্রুততম সময়ে এই জটিল সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাশা করছি।”

এদিকে আন্দোলনকারী দুটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনড় থেকে অবরোধ অব্যাহত রাখার আনুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়ায় সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট সময়সীমা পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সাজেকের পর্যটন খাত ও জীবনযাত্রা কবে নাগাদ স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটছে না।

সার্বিক বিষয়ে আরও হালনাগাদ তথ্য জানতে আন্দোলনকারী একাধিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

জনপ্রিয়

পোশাক খাতের শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রমাণ মিলল

সাজেক সড়কে ষষ্ঠ দিনের মতো অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, স্থবির পর্যটন খাত

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:১১:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বিশ্বখ্যাত সাজেক সড়কে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো অনির্দিষ্টকালের কঠোর সড়ক অবরোধ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এই আকস্মিক অবরোধের কারণে দেশের অন্যতম প্রধান ভ্রমণকাক্সিক্ষত পর্যটন কেন্দ্র সাজেকের সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সাথে স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে কোনো কার্যকর সমঝোতা হয়নি। বৈঠকটি ব্যর্থ হওয়ায় অবরুদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলন পরিচালনাকারী দুই প্রভাবশালী স্থানীয় সংগঠন—‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং ‘সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন’। এই অচলাবস্থার কারণে দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন উপত্যকা সাজেক ভ্যালিতে সার্বিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র মানসিক উদ্বেগ ও আর্থিক দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাজেক অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা সমর্থিত চিহ্নিত সশস্ত্র সদস্যদের দ্রুত অপসারণ করা এবং চলমান আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা। সুনির্দিষ্ট এসব যৌক্তিক দাবি নিয়ে স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে একাধিকবার প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত বর্তমান সংকট নিরসনে কোনো স্থায়ী ও দৃশ্যমান ইতিবাচক সমাধান বের হয়ে আসেনি।

বৈঠকেও মেলেনি সুনির্দিষ্ট সমাধান

গতকাল সোমবার বেলা শেষের দিকে সাজেকের উজোবাজার এলাকায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সরকারি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সাথে আন্দোলনকারীদের এক বিশেষ সংলাপ ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাজেক অঞ্চল থেকে সন্তু লারমা সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া ও নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। পরবর্তীতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, দাবিসমূহ পূরণ ও কার্যকর কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই অনড় সড়ক অবরোধ পূর্ণাঙ্গভাবে অব্যাহত থাকবে।

এর পূর্বে সাজেকসহ সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্ভূত সংঘাতময় ও অস্থির পরিস্থিতি নিরসনে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে নিবিড় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি আসনের জাতীয় সংসদ সদস্যরা। গত ২৫ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে আয়োজিত দুই জেলার হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে শীর্ষ প্রশাসনের বিশেষ বৈঠকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করার উদ্দেশ্যে তিন সদস্যের একটি সুনির্দিষ্ট কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সরকারি এসব উদ্যোগের পরও বাস্তব মাঠপর্যায়ে সংকট মোচনে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

সম্পূর্ণ বন্ধ যানবাহন চলাচল, চরম পর্যটকশূন্য সাজেক

ধারাবাহিক অবরুদ্ধ কর্মসূচির কারণে সাজেক সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পর্যটকদের স্বাভাবিক যাতায়াত ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে গত ২২ অক্টোবর সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থার অধীনে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ সহায়তায় সাজেকে অবস্থানরত প্রায় তিন হাজার আটকে পড়া পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ির দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। উক্ত পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই মূলত সাজেকের সমস্ত রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক ভ্রমণ কার্যক্রম পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।

উল্লেখ্য, গত ১১ অক্টোবরও একই ধরনের সড়ক অবরোধের দরুন সাজেকে পর্যটকদের প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অচলাবস্থা ও বৈরী সংকট তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে পবিত্র দুর্গাপূজার ছুটি উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সাময়িকভাবে অবরোধ শিথিল রাখা হলেও ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় দ্বিতীয় দফায় নতুন করে কঠোর অবরোধ শুরু হয়। ফলে খুব স্বল্প সময়ের জন্য পর্যটন কার্যক্রম চালুর মুখ দেখলেও আবারও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে সাজেক।

সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব

সাজেক ভ্যালির সার্বিক অর্থনীতি মূলত এখানকার দৃষ্টিনন্দন রিসোর্ট-কটেজ, নিজস্ব পরিবহন খাত, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ক্ষুদ্র দোকানপাট এবং হরেক রকম পর্যটকসেবার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অনাকাঙ্ক্ষিত এই অবরোধের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন সম্পূর্ণ থমকে যাওয়ায় এসব খাতের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটক না থাকায় সাজেকের কটেজ ও রিসোর্টগুলোর অগ্রিম বুকিং বাতিল হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী ‘চাঁদের গাড়ি’ ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ পরিবহন অচল হয়ে পড়েছে এবং খাবারের দোকান ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন আয় শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

অবরোধ শুরু হওয়ার আগে দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি ও পর্যটন মৌসুমের শুরুকে কেন্দ্র করে সাজেকের প্রায় সকল রিসোর্ট ও কটেজে শতভাগ অগ্রিম বুকিং নিশ্চিত ছিল বলে জানিয়েছিলেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু নতুন করে অবরোধ ও প্রশাসনের নিরাপত্তাজনিত নানা বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকরা বাধ্য হয়ে নিজেদের ভ্রমণ বাতিল বা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করায় কটেজ মালিকরা বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কটেজের কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ, পরিবহন পরিচালনা ব্যয় মেটানো এবং ব্যাংক বা এনজিওর ঋণের কিস্তি প্রদান নিয়ে মারাত্মক সংকট দেখা দেবে।

এর আগে পর্যটন স্থবির হয়ে পড়ার কারণে সাজেকের পর্যটন ও পরিবহন খাতে কোটি কোটি টাকার অপূরণীয় ব্যবসায়িক ক্ষতির তথ্য জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা। দীর্ঘায়িত এই অবরোধের ফলে চলমান ক্ষতির পরিমাণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে গভীর শঙ্কায় রয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সাজেকের অন্যতম জনপ্রিয় ‘রুইলুই রিসোর্ট’-এর পরিচালক মিশু দে এ প্রসঙ্গে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অনাকাঙ্ক্ষিত অবরোধ ও প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞার কারণে সম্পূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রটি আপাতত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ভ্রমণের মূল পর্যটন মৌসুমের একদম শুরুতেই এমন অভূতপূর্ব অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, রিসোর্ট কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। উদ্ভূত প্রশাসনিক ও সামাজিক সংকটের দ্রুত সমাধান না করা হলে এই বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় স্থানীয় জনসাধারণ

সাজেক উপত্যকার বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে একদিকে আন্দোলনকারীরা নিজেদের পেশাগত ও সামাজিক সুরক্ষাসহ মূল দাবিগুলো পূরণের জোরালো নিশ্চয়তা দাবি করছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন। প্রধান সড়ক যোগাযোগ অবরুদ্ধ থাকায় সাজেকের পর্যটন খাতের পাশাপাশি স্থানীয়দের স্বাভাবিক কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনের তরফ থেকে দফায় দফায় আলোচনা ও সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও গতকালের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কোনো ইতিবাচক সমঝোতা না হওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতির আশু সমাধান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পর্যটন খাতের অপূরণীয় ক্ষতি রোধ করতে এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সকল পক্ষকে নিয়ে একটি সময়োপযোগী ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি বলে তাগিদ দিচ্ছেন অভিজ্ঞ মহল।

সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বর্তমান ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আমাদের সাজেকে প্রায় ১৩০টির মতো রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, যার প্রতিটিই এখন পুরোপুরি পর্যটকশূন্য ও ফাঁকা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর পাশাপাশি এখানকার স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, চায়ের স্টল, মুদির দোকান, ফুডকোর্ট এবং ভাসমান হকারসহ বিভিন্ন পেশার শত শত মানুষ কর্মহীন হয়ে বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। একই সাথে সাজেকের পাহাড়ি মানুষের উৎপাদিত নানা ধরনের ফলমূল ও জুমের তরতাজা ফসল বাজারজাত করতে না পারায় তা পচে নষ্ট হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে সাজেক এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর এক ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। আমরা দ্রুততম সময়ে এই জটিল সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাশা করছি।”

এদিকে আন্দোলনকারী দুটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনড় থেকে অবরোধ অব্যাহত রাখার আনুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়ায় সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট সময়সীমা পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সাজেকের পর্যটন খাত ও জীবনযাত্রা কবে নাগাদ স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটছে না।

সার্বিক বিষয়ে আরও হালনাগাদ তথ্য জানতে আন্দোলনকারী একাধিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।