আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে সবসময় অত্যন্ত গভীরভাবে সমর্থন করে জাপান বলে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
জাপানের স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১২টায় রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় ‘কানতেই’-তে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব ইতিবাচক মন্তব্য করেন।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি স্পষ্ট উল্লেখ করেন, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বহুগুণ জোরদার ও সুদৃঢ় করতে টোকিও গভীরভাবে আগ্রহী।
বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান বহুমুখী সহযোগিতা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে দুই দেশের শীর্ষ নেতা—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রত্যক্ষ যৌথ নেতৃত্বে হাই-প্রোফাইল এই শীর্ষ বৈঠক পরিচালিত হয়।
এর আগে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক কারিগরি সহযোগিতা সুসংহত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে মূল বৈঠকের পূর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কান্তেই ভবনে সানন্দে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
টোকিওর কান্তেই চত্বরে আগমনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাপানের সশস্ত্র বাহিনীর একটি আধুনিক ও চৌকস দলের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী সর্বোচ্চ ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে বাজানো হয়। গার্ড অব অনার গ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুসজ্জিত বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও গার্ড পরিদর্শন করেন। সম্পূর্ণ অভিবাদন পর্বকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একই মঞ্চে পাশাপাশি অবস্থান করেন।
বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর সফররত উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সাথে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সশরীরে পরিচয় করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইভাবে জাপানের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর নিজ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন।
পরিচিতি পর্বের সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভবনের মূল কক্ষে প্রবেশের দ্বারে রাখা সুনির্দিষ্ট স্মৃতি পরিদর্শন বইতে (ভিজিটরস বুক) ঐতিহাসিক স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরবর্তীতে দুই প্রধানমন্ত্রী এক বিশেষ রুদ্ধদ্বার একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।
দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সফরসূচির অংশ হিসেবে আজ দুপুরে কানতেই ভবনে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সফরসঙ্গীদের পরম সম্মানে এক বিশেষ আড়ম্বরপূর্ণ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এই মধ্যাহ্নভোজের প্রারম্ভে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত স্বাগত ভাষণ দেবেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শুভেচ্ছা পানপাত্র উত্থাপন করবেন। জবাবে সফরকারী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখবেন এবং পাল্টা শুভেচ্ছা পানপাত্র উত্থাপন করবেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন পথ তৈরি করা, বিভিন্ন উদীয়মান প্রধান খাতে জাপানের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানান আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান নিয়ে নিবিড় মতবিনিময় প্রধান স্থান দখল করে।
এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনমুখী মূল বিস্তৃত সড়কের দুই পাশে দৃশ্যমানভাবে বাংলাদেশ ও জাপানের জাতীয় পতাকা টাঙিয়ে দৃষ্টিনন্দন সাজে সজ্জিত করা হয়।
চার দিনের এই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বহুল প্রতীক্ষিত ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরাম’-এ প্রধান বক্তা হিসেবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এবং একই সাথে জাপানের খ্যাতনামা শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে অংশ নেবেন।
উল্লেখ্য, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সোমবার সকালে বিমানযোগে টোকিও গিয়ে পৌঁছান। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাঁকে অত্যন্ত উষ্ণ আতিথেয়তায় অভ্যর্থনা জানান জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি ও পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসুতাকা নাকাসোনে।
জাপান সফরের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে আসা একটি উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় প্রতিনিধি দল, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের শীর্ষ চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির’ (জাইকা) মহামান্য প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিগত ২০০৬ সালে জাপানে তাঁদের প্রথম ঐতিহাসিক সাক্ষাতের কথা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তিনি দুই দেশের সুসম্পর্ক রক্ষায় তারো আসোর অসামান্য প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে তাঁকে আবারও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান বলে টোকিওতে উপস্থিত সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
অপরদিকে বিশ্বখ্যাত মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সাথে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন এবং আইসিটি, জ্বালানি ও উচ্চ প্রযুক্তির ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বিপুল জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়। এ সময় চট্টগ্রামস্থ কাফকো সার কারখানার আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের কারিগরি সম্ভাবনা নিয়েও দুই পক্ষের কথা হয়।
এ ছাড়া জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মেগা অবকাঠামো ও সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের অব্যাহত সহায়তা প্রদান, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা এবং দুই দেশের দক্ষতা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। বৈঠকের আলোচনায় একটি উন্নত প্রযুক্তি গ্রাম ও আধুনিক উদ্ভাবন নগরী প্রতিষ্ঠার বিষয় স্থান পায়। এর পাশাপাশি দেশের কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন তারা।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক টোকিও সফরের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, দেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য-প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন— বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী এবং আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।
উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর বিদেশে এটি তারেক রহমানের তৃতীয় সরকারি সফর। এর আগে তিনি সফল সফরে মালয়েশিয়া ও চীন ভ্রমণ করেন। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে তিনি নিউইয়র্ক গমন করেছিলেন।






















