Dhaka ০৯:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

সাংবাদিকেরা মাদকের টাকা না পেলে পুলিশ অকার্যকর লেখেন: আইজিপি

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০২:৪৯:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৮ বার দেখা হয়েছে

রাজধানীর পুরান ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে দেশের সাংবাদিক সমাজ এবং মাদকের অপব্যবহার নিয়ে এক তীব্র বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, কিছু সাংবাদিক মূলত মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত অনৈতিক টাকা না পেলেই হুট করে সংবাদমাধ্যমে পুলিশকে অকার্যকর বা ব্যর্থ বলে সংবাদ পরিবেশন করতে শুরু করেন।

আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক চকবাজারে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বিতর্কিত ও কঠোর মন্তব্য তুলে ধরেন।

বক্তব্যে আইজিপি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের কোনো নাগরিক বা গোষ্ঠী যেন কোনো অবস্থাতেই নিজের হাতে আইন তুলে না নেন। বর্তমানে সমাজে নানা ধরনের ক্ষতিকর গুজব এবং পুরোপুরি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ জাতিকে অনবরত বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। বিগত ১৭ বছরের ক্ষমতাচ্যুত শাসনামলে যারা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছিলেন, তারা দেশকে বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অকার্যকর করে রেখে গিয়েছিলেন।

মাদকের বিস্তার ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মাদকের মারাত্মক বিস্তার ঘটেছে। তৎকালীন সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী নেতারা মাদক কারবার থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায় করতেন। সেই সময় পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যও এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যাদের অনেকে এখনো রয়ে গেছেন। তবে বর্তমান পুলিশ বিভাগ নিজ প্রতিষ্ঠানের অপরাধীদের বিরুদ্ধেও চরম দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। কেবল গত দুই মাসের ব্যবধানেই সুনির্দিষ্ট অপরাধে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে আদালতের মাধ্যমে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েও বাইরে নানামুখী অপব্যাখ্যা ছড়ানো হচ্ছে।”

মাদক সেবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে বেপরোয়া আচরণের সমালোচনা করে আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ যদি পুলিশ হাউজিংয়ের সুরক্ষিত ভেতরে বসে গোপনে মদ পান করেন, উন্মুক্ত মাতলামি করেন কিংবা প্রাণঘাতী কোকেন ও হেরোইন গ্রহণ করেন—তবে এ ধরনের অপকর্ম কোনোভাবেই দেশের সংবিধানসম্মত নয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার মানে এই নয় যে, যার যা ইচ্ছা তা-ই করার অবাধ অধিকার পেয়ে গেছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক নৈতিকতা ও প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।”

পুলিশের ওপর অন্যায় আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া এবং পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা না করার মানসিকতা থাকলে সমাজে সঠিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একদিকে পুলিশ বাহিনীকে অশিক্ষিত বলে কটাক্ষ করা হয়, আবার অন্যদিকে সাধারণ কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার নূ্যনতম প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করতে হয় বলে পুলিশে অত্যন্ত শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল থাকা আবশ্যক।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের ব্যর্থতা এবং শিল্পকারখানার শ্রমিক অসন্তোষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্যরা দায়িত্ব পালনে ফেল করছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে; শিল্পকারখানায় ঠিকমতো বেতন দিতে না পারলে মালিকদের ব্যর্থতায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশকে মারমুখী হতে হচ্ছে। আবার আইন প্রয়োগ করে কাউকে কারাগারে পাঠালে পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতা হরণের মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এভাবে চতুর্মুখী চাপে পুলিশকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করে শেষ পর্যন্ত সব দায়ভার পুলিশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান মেনে সবাইকে চলতে হবে। সমাজে স্থায়ী শান্তি ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে পুলিশকে নিজেদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালনের সুযোগ দেওয়া চাই। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেই পুলিশকে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে।”

পুলিশের দাপ্তরিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা নিয়ে আইজিপি বলেন, “পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনো অপরাধের পর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, কেবল তখনই সমাজের মানুষের প্রশ্ন তোলার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তবে ভিত্তিহীন মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবে কান না দিয়ে মূল প্রকৃত ঘটনা চিহ্নিত করে সঠিক আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।”

মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের সমালোচনা এবং সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, “মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে যখনই কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তখন কেউ কেউ নিজেরাই অসৎ উদ্দেশ্যে মব তৈরি করছেন এবং সেখান থেকে গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর সাংবাদিক সাহেবরা ওখান থেকে যখন প্রত্যাশিত পয়সা না পাইতেছেন, ঠিক তখনই সংবাদপত্রে লিখতেছেন যে পুলিশ নাকি এই দেশে অকার্যকর হয়ে গেছে! কেন, আমরা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করি নাই, আমরা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অতিরিক্ত বলপ্রয়োগও করিনি।”

বিগত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি স্মরণ করে আইজিপি জানান, “সেই কঠিন সময়ে পুলিশ সদস্যরা ভয়ে রাজপথে নামতে পারতেন না, এমনকি ইউনিফর্ম পরে ডিউটিতে যাওয়ার সাহসটুকু পাননি। সেই চরম নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমান সরকারের সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে। এই মহান কাজে দেশের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”

আসন্ন নির্বাচন ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কে রাজনৈতিক অঙ্গনে আসবে, অমুক আপা কবে দেশে ফিরবে, কী হবে—ওসব রাজনৈতিক বিষয় দেখা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ নয়। আমাদের মূল আইনি দায়িত্ব হলো সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, ঠিক সেটাই আমরা প্রয়োগ করব। অপরাধ দমনে যেখানে সরাসরি ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হবে, সরকার যদি প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় তবে আমরা সেটাই করব। পুলিশ কঠোর বলপ্রয়োগ করলে তাকে ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। এ অবস্থায় পুলিশকে কাজ করার সঠিক পরিবেশ দিতে হবে এবং নিজ দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ক্ষমতায়ন করতে হবে।”

আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিশেষে বলেন, “পুলিশকে অহেতুক ব্ল্যাকমেইল করার কোনো অপচেষ্টা করা যাবে না, আবার পুলিশ সদস্যরাও যেন কোনো ব্ল্যাকমেইলের শিকার না হন সেদিকে নজর রাখতে হবে। সামাজিকভাবে সব পক্ষের লক্ষ্য শান্তি স্থাপন হলেও দেখা যায় শালিস-দরবারে সবাই কেবল নিজেদের পক্ষে একক সিদ্ধান্ত চান। এ ধরনের মানসিকতা থেকে সবাইকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে হবে।”

উল্লেখ্য, চকবাজারে আয়োজিত ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক’-এর এই বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত পরিচালকরা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

সাংবাদিকেরা মাদকের টাকা না পেলে পুলিশ অকার্যকর লেখেন: আইজিপি

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০২:৪৯:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর পুরান ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে দেশের সাংবাদিক সমাজ এবং মাদকের অপব্যবহার নিয়ে এক তীব্র বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, কিছু সাংবাদিক মূলত মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত অনৈতিক টাকা না পেলেই হুট করে সংবাদমাধ্যমে পুলিশকে অকার্যকর বা ব্যর্থ বলে সংবাদ পরিবেশন করতে শুরু করেন।

আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক চকবাজারে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বিতর্কিত ও কঠোর মন্তব্য তুলে ধরেন।

বক্তব্যে আইজিপি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের কোনো নাগরিক বা গোষ্ঠী যেন কোনো অবস্থাতেই নিজের হাতে আইন তুলে না নেন। বর্তমানে সমাজে নানা ধরনের ক্ষতিকর গুজব এবং পুরোপুরি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ জাতিকে অনবরত বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। বিগত ১৭ বছরের ক্ষমতাচ্যুত শাসনামলে যারা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছিলেন, তারা দেশকে বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অকার্যকর করে রেখে গিয়েছিলেন।

মাদকের বিস্তার ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মাদকের মারাত্মক বিস্তার ঘটেছে। তৎকালীন সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী নেতারা মাদক কারবার থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায় করতেন। সেই সময় পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যও এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যাদের অনেকে এখনো রয়ে গেছেন। তবে বর্তমান পুলিশ বিভাগ নিজ প্রতিষ্ঠানের অপরাধীদের বিরুদ্ধেও চরম দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। কেবল গত দুই মাসের ব্যবধানেই সুনির্দিষ্ট অপরাধে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে আদালতের মাধ্যমে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েও বাইরে নানামুখী অপব্যাখ্যা ছড়ানো হচ্ছে।”

মাদক সেবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে বেপরোয়া আচরণের সমালোচনা করে আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ যদি পুলিশ হাউজিংয়ের সুরক্ষিত ভেতরে বসে গোপনে মদ পান করেন, উন্মুক্ত মাতলামি করেন কিংবা প্রাণঘাতী কোকেন ও হেরোইন গ্রহণ করেন—তবে এ ধরনের অপকর্ম কোনোভাবেই দেশের সংবিধানসম্মত নয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার মানে এই নয় যে, যার যা ইচ্ছা তা-ই করার অবাধ অধিকার পেয়ে গেছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক নৈতিকতা ও প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।”

পুলিশের ওপর অন্যায় আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া এবং পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা না করার মানসিকতা থাকলে সমাজে সঠিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একদিকে পুলিশ বাহিনীকে অশিক্ষিত বলে কটাক্ষ করা হয়, আবার অন্যদিকে সাধারণ কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার নূ্যনতম প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করতে হয় বলে পুলিশে অত্যন্ত শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল থাকা আবশ্যক।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের ব্যর্থতা এবং শিল্পকারখানার শ্রমিক অসন্তোষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্যরা দায়িত্ব পালনে ফেল করছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে; শিল্পকারখানায় ঠিকমতো বেতন দিতে না পারলে মালিকদের ব্যর্থতায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশকে মারমুখী হতে হচ্ছে। আবার আইন প্রয়োগ করে কাউকে কারাগারে পাঠালে পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতা হরণের মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এভাবে চতুর্মুখী চাপে পুলিশকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করে শেষ পর্যন্ত সব দায়ভার পুলিশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান মেনে সবাইকে চলতে হবে। সমাজে স্থায়ী শান্তি ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে পুলিশকে নিজেদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালনের সুযোগ দেওয়া চাই। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেই পুলিশকে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে।”

পুলিশের দাপ্তরিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা নিয়ে আইজিপি বলেন, “পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনো অপরাধের পর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, কেবল তখনই সমাজের মানুষের প্রশ্ন তোলার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তবে ভিত্তিহীন মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবে কান না দিয়ে মূল প্রকৃত ঘটনা চিহ্নিত করে সঠিক আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।”

মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের সমালোচনা এবং সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, “মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে যখনই কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তখন কেউ কেউ নিজেরাই অসৎ উদ্দেশ্যে মব তৈরি করছেন এবং সেখান থেকে গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর সাংবাদিক সাহেবরা ওখান থেকে যখন প্রত্যাশিত পয়সা না পাইতেছেন, ঠিক তখনই সংবাদপত্রে লিখতেছেন যে পুলিশ নাকি এই দেশে অকার্যকর হয়ে গেছে! কেন, আমরা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করি নাই, আমরা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অতিরিক্ত বলপ্রয়োগও করিনি।”

বিগত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি স্মরণ করে আইজিপি জানান, “সেই কঠিন সময়ে পুলিশ সদস্যরা ভয়ে রাজপথে নামতে পারতেন না, এমনকি ইউনিফর্ম পরে ডিউটিতে যাওয়ার সাহসটুকু পাননি। সেই চরম নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমান সরকারের সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে। এই মহান কাজে দেশের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”

আসন্ন নির্বাচন ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কে রাজনৈতিক অঙ্গনে আসবে, অমুক আপা কবে দেশে ফিরবে, কী হবে—ওসব রাজনৈতিক বিষয় দেখা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ নয়। আমাদের মূল আইনি দায়িত্ব হলো সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, ঠিক সেটাই আমরা প্রয়োগ করব। অপরাধ দমনে যেখানে সরাসরি ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হবে, সরকার যদি প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় তবে আমরা সেটাই করব। পুলিশ কঠোর বলপ্রয়োগ করলে তাকে ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। এ অবস্থায় পুলিশকে কাজ করার সঠিক পরিবেশ দিতে হবে এবং নিজ দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ক্ষমতায়ন করতে হবে।”

আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিশেষে বলেন, “পুলিশকে অহেতুক ব্ল্যাকমেইল করার কোনো অপচেষ্টা করা যাবে না, আবার পুলিশ সদস্যরাও যেন কোনো ব্ল্যাকমেইলের শিকার না হন সেদিকে নজর রাখতে হবে। সামাজিকভাবে সব পক্ষের লক্ষ্য শান্তি স্থাপন হলেও দেখা যায় শালিস-দরবারে সবাই কেবল নিজেদের পক্ষে একক সিদ্ধান্ত চান। এ ধরনের মানসিকতা থেকে সবাইকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে হবে।”

উল্লেখ্য, চকবাজারে আয়োজিত ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক’-এর এই বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত পরিচালকরা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।