Dhaka ০৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

পাকিস্তান কাশ্মীরের মানুষকে রক্ষা করছে: ফারুক আব্দুল্লাহ

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:৩৭:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার দেখা হয়েছে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাশ্মীর সংবেদনশীল ইস্যুটি বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমেই মূলত পাকিস্তান কাশ্মীরের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করে চলেছে বলে এক মন্তব্য করে ব্যাপক রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (এনসি) সভাপতি ড. ফারুক আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ তুলেছেন যে, কাশ্মীরিদের মৌলিক অধিকার ও সার্বিক বিষয়ে ভারতের কেন্দ্র সরকারের নিয়ত উদ্দেশ্য একেবারেই ভালো বা শুভ নয়।

অন্যদিকে, বর্ষীয়ান এই কাশ্মীরি নেতার এমন বিস্ফোরক মন্তব্যে চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিজেপির শীর্ষ নেতারা ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্যকে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ও ভারতবিরোধী আখ্যা দিয়ে জনগণের কাছে তাঁর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন। এমনকি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁকে ভারতে না থেকে স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে চলে যাওয়ারও খোলামেলা পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) জম্মু-কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা বারামুল্লায় আয়োজিত নিজ দলের এক বিশাল কর্মী সম্মেলনে দেওয়া আবেগঘন বক্তব্যে ফারুক আবদুল্লাহ এই মন্তব্যগুলো উপস্থাপন করেন। সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী সমবেত কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক চাপের কারণেই আজ কিন্তু দিল্লির ভারত সরকার কিছুটা নীরবতা অবলম্বন করে রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র (পাকিস্তান) বিশ্বের প্রতিটি কূটনৈতিক মঞ্চে গিয়ে প্রতিনিয়ত জোরালো ভাষায় বলছে যে, কাশ্মীর সংকটের স্থায়ী সমাধান আজও হয়নি। মূলত তারাই আমাদের রক্ষা করছে; তা না হলে দিল্লির কেন্দ্র সরকারের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য একেবারেই ভালো নয়।’

দীর্ঘদিন ধরে চলা কাশ্মীর সংকটে জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আদৌ কোনো দিন সুবিচার বা ন্যায়বিচার আশা করতে পারে কি না—এমন বড় প্রশ্ন তোলেন ফারুক আবদুল্লাহ। একই সাথে কাশ্মীরিদের নিজস্ব অধিকার, অস্তিত্ব এবং মৌলিক পরিচয় টিকিয়ে রাখতে সাহসের সাথে সোচ্চার হওয়ার জোর আহ্বান জানান তিনি।

উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশে ফারুক আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসকদের কাছ থেকে আপনারা আসলে কী আশা করেন? তারা আপনাদের কোনো দিন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে বলে কি সত্যি বিশ্বাস করেন? নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত সাহস বুকের ভেতর রাখুন। তা না করতে পারলে অচিরেই আপনারা এ ভূখণ্ড থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন এবং আপনাদের শতাব্দী প্রাচীন নিজস্ব পরিচয়ও চিরতরে হারিয়ে যাবে।’

বারামুল্লার উক্ত কর্মী সম্মেলনে বিজেপি-শাসিত ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ঐতিহাসিক মসজিদসহ মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, দোকানপাট ও বাড়িঘর অবৈধ আখ্যা দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক অভিযান নিয়েও সোচ্চার হন ফারুক। তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন, সরকারের এসব বিতর্কিত উচ্ছেদ অভিযানে সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তাদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সম্পত্তি বেশি ধ্বংস করা হচ্ছে। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে বিজেপির এই আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।

যে ধরনের উগ্র রাজনৈতিক শাসনামলে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেই শাসকগোষ্ঠীকে সাধারণ মুসলমানেরা কীভাবে এখনো সমর্থন দিতে পারেন—তা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তোলেন প্রবীণ এই নেতা। একই সঙ্গে নিজেদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় একজোটে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর থেকে জম্মু-কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ফারুক আবদুল্লাহরই পুত্র ওমর আবদুল্লাহ। তবে বাবার এই সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্যের পর তিনি এখনো প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি।

তবে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দলটির শাসনাধীন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য সরকারের দাবি, সম্পূর্ণ ধর্মীয় পরিচয় বা বৈষম্য বিবেচনা না করে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কেবল অননুমোদিত সরকারি জায়গা দখল ও অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধেই নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। যদিও ভারতের প্রধান বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সমালোচকদের স্পষ্ট অভিযোগ, সরকারের এসব অভিযানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুসলমানদের সম্পত্তিকেই বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশের পক্ষপাতমূলক ভূমিকারও কড়া সমালোচনা করেছেন ফারুক আবদুল্লাহ। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, এসব গণমাধ্যমের সিংহভাগ এখন ক্ষমতাসীন সরকারের ‘অর্থের বিনিময়ে প্রচার চালানো অন্ধ মুখপাত্র’ হিসেবে কাজ করে চলেছে।

তিনি আরও অভিযোগ তোলেন যে, বিপুল আর্থিক প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপুটে চাপের কারণে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ সম্পাদকীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সরকারের অনিয়ম ও দমনপীড়নের সমালোচনা করা স্বাধীন সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত পুলিশি তলব, আইনি হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্যের পরপরই তাঁর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। জম্মু-কাশ্মীরে দলটির প্রাদেশিক প্রধান সত শর্মা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে যদি তিনি এই ধরনের পাকিস্তানপ্রীতি বক্তব্য দেওয়া অব্যাহত রাখেন, তবে তাঁকে ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে গিয়ে বসবাসের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএনআই-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়া সূত্রে সত শর্মা বলেন, ‘ফারুক আবদুল্লাহর একটি বিষয় ভালোভাবে বোঝা উচিত যে, এই গণতান্ত্রিক ভারতে স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছা তা বলার যে বাক স্বাধীনতা তিনি ভোগ করছেন, তা কেবল এই দেশেই সম্ভব। আজ এই মহান স্বাধীনতা রয়েছে বলেই তিনি এ ধরনের চরম দেশবিরোধী বক্তব্য দিতে পারছেন। যদি একই ধরনের বিতর্কিত কথা তিনি পাকিস্তানে গিয়ে বলতেন, তবে হয়তো তাঁকে মোটেও ছাড় দেওয়া হতো না।’

ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ মুসলমানেরা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভারতেই সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুখে রয়েছে বলে দাবি করেন এই বিজেপি নেতা। সত শর্মা দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বিজেপি কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ বরদাস্ত করবে না। ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কাছে তাঁকে অবিলম্বে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। আর তা না করতে পারলে আমি বলব, পাকিস্তানই হবে তাঁর জন্য বসবাসের সেরা জায়গা এবং তাঁর সেখানেই চলে যাওয়া উচিত।’

উল্লেখ্য, পাকিস্তান বিগত একাধিক দশক ধরেই বিশ্ব দরবারে জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাশ্মীর এবং কাশ্মীরিদের ওপর ভারতের বিতর্কিত নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার কথা বলে আসছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধানে জম্মু-কাশ্মীরকে দেওয়া বিশেষ মর্যাদাবাহী ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর থেকে পাকিস্তানের এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচার আরো বহু গুণে বৃদ্ধি পায়।

মূলত ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় সংসদে সংবিধানে বর্ণিত ঐতিহাসিক ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ভারতের মানচিত্রে সাবেক এই পূর্ণাঙ্গ রাজ্যটিকে পুনর্গঠন করে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খণ্ড বিখণ্ড করা হয়—যার একটি জম্মু-কাশ্মীর এবং অপরটি লাদাখ। ভারতের এই সিদ্ধান্তকে শুরু থেকেই চরম অবৈধ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বমঞ্চে এর তীব্র ও নিরবচ্ছিন্ন বিরোধিতা করে আসছে পাকিস্তান।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

পাকিস্তান কাশ্মীরের মানুষকে রক্ষা করছে: ফারুক আব্দুল্লাহ

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:৩৭:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাশ্মীর সংবেদনশীল ইস্যুটি বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমেই মূলত পাকিস্তান কাশ্মীরের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করে চলেছে বলে এক মন্তব্য করে ব্যাপক রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (এনসি) সভাপতি ড. ফারুক আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ তুলেছেন যে, কাশ্মীরিদের মৌলিক অধিকার ও সার্বিক বিষয়ে ভারতের কেন্দ্র সরকারের নিয়ত উদ্দেশ্য একেবারেই ভালো বা শুভ নয়।

অন্যদিকে, বর্ষীয়ান এই কাশ্মীরি নেতার এমন বিস্ফোরক মন্তব্যে চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিজেপির শীর্ষ নেতারা ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্যকে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক ও ভারতবিরোধী আখ্যা দিয়ে জনগণের কাছে তাঁর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন। এমনকি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁকে ভারতে না থেকে স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে চলে যাওয়ারও খোলামেলা পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) জম্মু-কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা বারামুল্লায় আয়োজিত নিজ দলের এক বিশাল কর্মী সম্মেলনে দেওয়া আবেগঘন বক্তব্যে ফারুক আবদুল্লাহ এই মন্তব্যগুলো উপস্থাপন করেন। সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী সমবেত কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক চাপের কারণেই আজ কিন্তু দিল্লির ভারত সরকার কিছুটা নীরবতা অবলম্বন করে রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র (পাকিস্তান) বিশ্বের প্রতিটি কূটনৈতিক মঞ্চে গিয়ে প্রতিনিয়ত জোরালো ভাষায় বলছে যে, কাশ্মীর সংকটের স্থায়ী সমাধান আজও হয়নি। মূলত তারাই আমাদের রক্ষা করছে; তা না হলে দিল্লির কেন্দ্র সরকারের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য একেবারেই ভালো নয়।’

দীর্ঘদিন ধরে চলা কাশ্মীর সংকটে জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আদৌ কোনো দিন সুবিচার বা ন্যায়বিচার আশা করতে পারে কি না—এমন বড় প্রশ্ন তোলেন ফারুক আবদুল্লাহ। একই সাথে কাশ্মীরিদের নিজস্ব অধিকার, অস্তিত্ব এবং মৌলিক পরিচয় টিকিয়ে রাখতে সাহসের সাথে সোচ্চার হওয়ার জোর আহ্বান জানান তিনি।

উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশে ফারুক আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসকদের কাছ থেকে আপনারা আসলে কী আশা করেন? তারা আপনাদের কোনো দিন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে বলে কি সত্যি বিশ্বাস করেন? নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত সাহস বুকের ভেতর রাখুন। তা না করতে পারলে অচিরেই আপনারা এ ভূখণ্ড থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন এবং আপনাদের শতাব্দী প্রাচীন নিজস্ব পরিচয়ও চিরতরে হারিয়ে যাবে।’

বারামুল্লার উক্ত কর্মী সম্মেলনে বিজেপি-শাসিত ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ঐতিহাসিক মসজিদসহ মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, দোকানপাট ও বাড়িঘর অবৈধ আখ্যা দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক অভিযান নিয়েও সোচ্চার হন ফারুক। তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন, সরকারের এসব বিতর্কিত উচ্ছেদ অভিযানে সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তাদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় সম্পত্তি বেশি ধ্বংস করা হচ্ছে। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে বিজেপির এই আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।

যে ধরনের উগ্র রাজনৈতিক শাসনামলে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেই শাসকগোষ্ঠীকে সাধারণ মুসলমানেরা কীভাবে এখনো সমর্থন দিতে পারেন—তা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তোলেন প্রবীণ এই নেতা। একই সঙ্গে নিজেদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় একজোটে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর থেকে জম্মু-কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ফারুক আবদুল্লাহরই পুত্র ওমর আবদুল্লাহ। তবে বাবার এই সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্যের পর তিনি এখনো প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি।

তবে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দলটির শাসনাধীন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য সরকারের দাবি, সম্পূর্ণ ধর্মীয় পরিচয় বা বৈষম্য বিবেচনা না করে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কেবল অননুমোদিত সরকারি জায়গা দখল ও অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধেই নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। যদিও ভারতের প্রধান বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সমালোচকদের স্পষ্ট অভিযোগ, সরকারের এসব অভিযানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুসলমানদের সম্পত্তিকেই বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশের পক্ষপাতমূলক ভূমিকারও কড়া সমালোচনা করেছেন ফারুক আবদুল্লাহ। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, এসব গণমাধ্যমের সিংহভাগ এখন ক্ষমতাসীন সরকারের ‘অর্থের বিনিময়ে প্রচার চালানো অন্ধ মুখপাত্র’ হিসেবে কাজ করে চলেছে।

তিনি আরও অভিযোগ তোলেন যে, বিপুল আর্থিক প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপুটে চাপের কারণে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ সম্পাদকীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সরকারের অনিয়ম ও দমনপীড়নের সমালোচনা করা স্বাধীন সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত পুলিশি তলব, আইনি হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে ফারুক আবদুল্লাহর বক্তব্যের পরপরই তাঁর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। জম্মু-কাশ্মীরে দলটির প্রাদেশিক প্রধান সত শর্মা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে যদি তিনি এই ধরনের পাকিস্তানপ্রীতি বক্তব্য দেওয়া অব্যাহত রাখেন, তবে তাঁকে ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে গিয়ে বসবাসের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএনআই-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়া সূত্রে সত শর্মা বলেন, ‘ফারুক আবদুল্লাহর একটি বিষয় ভালোভাবে বোঝা উচিত যে, এই গণতান্ত্রিক ভারতে স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছা তা বলার যে বাক স্বাধীনতা তিনি ভোগ করছেন, তা কেবল এই দেশেই সম্ভব। আজ এই মহান স্বাধীনতা রয়েছে বলেই তিনি এ ধরনের চরম দেশবিরোধী বক্তব্য দিতে পারছেন। যদি একই ধরনের বিতর্কিত কথা তিনি পাকিস্তানে গিয়ে বলতেন, তবে হয়তো তাঁকে মোটেও ছাড় দেওয়া হতো না।’

ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ মুসলমানেরা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভারতেই সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুখে রয়েছে বলে দাবি করেন এই বিজেপি নেতা। সত শর্মা দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বিজেপি কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ বরদাস্ত করবে না। ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কাছে তাঁকে অবিলম্বে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। আর তা না করতে পারলে আমি বলব, পাকিস্তানই হবে তাঁর জন্য বসবাসের সেরা জায়গা এবং তাঁর সেখানেই চলে যাওয়া উচিত।’

উল্লেখ্য, পাকিস্তান বিগত একাধিক দশক ধরেই বিশ্ব দরবারে জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাশ্মীর এবং কাশ্মীরিদের ওপর ভারতের বিতর্কিত নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার কথা বলে আসছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধানে জম্মু-কাশ্মীরকে দেওয়া বিশেষ মর্যাদাবাহী ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর থেকে পাকিস্তানের এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচার আরো বহু গুণে বৃদ্ধি পায়।

মূলত ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় সংসদে সংবিধানে বর্ণিত ঐতিহাসিক ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ভারতের মানচিত্রে সাবেক এই পূর্ণাঙ্গ রাজ্যটিকে পুনর্গঠন করে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খণ্ড বিখণ্ড করা হয়—যার একটি জম্মু-কাশ্মীর এবং অপরটি লাদাখ। ভারতের এই সিদ্ধান্তকে শুরু থেকেই চরম অবৈধ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বমঞ্চে এর তীব্র ও নিরবচ্ছিন্ন বিরোধিতা করে আসছে পাকিস্তান।