সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ পরিচালন কার্যক্রমে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত সংকটের ফলে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবগামী ফ্লাইট চলাচলে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একের পর এক বিমান চলাচল স্থগিত বা বাতিল হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন দেশটিতে যাতায়াতকারী প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা কর্মী, ব্যবসায়ী এবং পবিত্র ওমরাহ পালনে ইচ্ছুক যাত্রীরা। প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত মোট ১৪৪টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন অন্তত ২২ হাজার ২১ জন যাত্রী।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর দেওয়া সর্বশেষ ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, আকস্মিক স্থগিত হওয়া এই মোট ১৪৪টি বিমানের মধ্যে ঠিক ৬৭টি সরাসরি এবং বাকি ৭৭টি হলো বিভিন্ন দেশের ট্রানজিটভিত্তিক ফ্লাইট।
সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করা প্রধান চারটি বিমান সংস্থার ভেতরে এককভাবে সর্বোচ্চ ২৮টি ফ্লাইট স্থগিত করেছে আমাদের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এছাড়া সৌদি আরবের নিজস্ব পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান সৌদিয়ার ১৯টি, দেশের বেসরকারি খাতের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি এবং রিয়াদ এয়ারের ১০টি নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
অপরদিকে, বিভিন্ন দেশের মধ্যবর্তী বিমানবন্দর হয়ে চলাচলকারী ট্রানজিট ফ্লাইটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতীয় এয়ারলাইন্স ইন্ডিগোর ৩০টি, মধ্যপ্রাচ্যের জায়ান্ট এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৮টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৮টি, ওমানের সালাম এয়ারের ৭টি এবং ইজিপ্টএয়ারের ১টি ফ্লাইট স্থগিতের তালিকায় রয়েছে।
সৌদি ভূখণ্ডের বিমানবন্দরগুলোর চলমান অপারেশনাল সীমাবদ্ধতার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ফ্লাইটগুলোর ওপরেও পড়তে শুরু করেছে। ফলে যেসব যাত্রীরা অন্য কোনো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের বিমানবন্দর ঘুরে বিকল্প উপায়ে সৌদি আরব পৌঁছানোর আগাম পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁরাও নির্ধারিত সময়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে পড়েছেন। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জেরে অসংখ্য যাত্রীকে বাধ্য হয়ে তাঁদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণসূচি রদবদল করতে হচ্ছে, টিকিটের তারিখ নতুন করে পুনর্নির্ধারণ কিংবা সম্পূর্ণ বিকল্প কোনো ফ্লাইটের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটতে হচ্ছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী এই বিশাল সংখ্যক যাত্রীর মধ্যে ঠিক কতজন বিকল্প ফ্লাইটের সুব্যবস্থা পেয়েছেন, কতজন তাঁদের টিকিটের তারিখ সফলভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং কতজন টিকিটের আর্থিক মূল্য পুরোপুরি ফেরত (রিফান্ড) পেয়েছেন—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিস্তারিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
চলমান এই ফ্লাইট স্থগিত ও বাতিলের আকস্মিক ঝড়ে সবচেয়ে বেশি চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মুখে পড়েছেন জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবগামী নতুন ও পুরনো প্রবাসী কর্মীরা। নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে গিয়ে হাজিরা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আকস্মিক চাকরি হারানোর ঝুঁকি এবং নানামুখী মারাত্মক আর্থিক জটিলতা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সাথে পবিত্র ওমরাহযাত্রী এবং বাণিজ্যিক কাজে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক ও ধর্মীয় ভ্রমণ পরিকল্পনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এমন এক সংকটাপন্ন ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানে সংশ্লিষ্ট সবকটি এয়ারলাইন্স ও বিপণন সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীদের দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দেওয়া, টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের ফি মওকুফ কিংবা সহজ করা এবং অর্থ ফেরতের বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও স্পষ্ট নির্দেশনা প্রচারের পাশাপাশি নিয়মিত আপডেট তথ্য সরবরাহের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সৌদি আরবের নিজস্ব বিমানবন্দরগুলোর সার্বিক পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ওপরই মূলত বাংলাদেশ রুটের ফ্লাইট চলাচল সম্পূর্ণ পুনরায় সচল হওয়া নির্ভর করছে। সার্বিক এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে যেকোনো যাত্রী ভ্রমণের চূড়ান্ত টিকিট কাটার আগে অবশ্যই স্ব স্ব এয়ারলাইন্সের অফিশিয়াল কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য জোরালো পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ১৪৪টি ফ্লাইট বাতিলের মতো বড় ঘটনায় ২২ হাজারেরও বেশি নিরীহ যাত্রীর এই মর্মান্তিক দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীল এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে অবিলম্বে সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বিকল্প নিরাপদ ভ্রমণব্যবস্থার নিশ্চয়তা বিধান, জটিলতাহীন টিকিট পরিবর্তন প্রক্রিয়া এবং রিফান্ডের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিকল্প নেই।






















