সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা বহুল আলোচিত পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় হাইকোর্ট কর্তৃক দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির চূড়ান্ত তারিখ আগামী ৮ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সুনির্দিষ্টভাবে বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক আপিল শুনানির জন্য এই দিন ধার্য ও পুনর্নির্ধারণ করেন।
মামলার পূর্ব পটভূমি পর্যালোচনায় জানা যায়, এর আগে ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার পথচারী দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে নির্মমভাবে হত্যা করার সুনির্দিষ্ট অপরাধে মোট ৮ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপরাপর ১৩ জন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের কঠোর সাজা প্রদান করেছিলেন আদালত। ঢাকার ৪ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক এবিএম নিজামুল হক চাঞ্চল্যকর এই রায় ঘোষণা করেছিলেন।
পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বিচারিক আদালতের উক্ত রায়ের ওপর আংশিক সংশোধন এনে হাইকোর্ট এক পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। হাইকোর্টের সেই রায়ে পূর্বে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৮ জনের মধ্যে ২ জনের প্রাণদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং বাকি ৬ জনের মধ্যে ৪ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করা হয় ও অপরাপর ২ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তৎকালীন বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস এবং বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর যৌথ স্বাক্ষরের পর ৮০ পৃষ্ঠার এই বিস্তৃত হাইকোর্ট রায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
বিচারিক আদালতে শুরুতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া ৮ জন আসামি হলেন— রফিকুল ইসলাম শাকিল, মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হক এমদাদ, জি এম রাশেদুজ্জামান শাওন, সাইফুল ইসলাম, কাইয়ুম মিঞা টিপু, রাজন তালুকদার এবং মীর মো. নূরে আলম লিমন।
অন্যদিকে, বিচারিক আদালত থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া ১৩ জন আসামি হলেন— এএইচএম কিবরিয়া, ইউনুস আলী, তারিক বিন জোহর তমাল, গোলাম মোস্তফা, আলাউদ্দিন, ওবায়দুর কাদের তাহসিন, ইমরান হোসেন, আজিজুর রহমান, আল-আমিন, রফিকুল ইসলাম, মনিরুল হক পাভেল, মোশাররফ হোসেন এবং কামরুল হাসান। নিম্ন আদালত বিচারকালে এই আসামিদের প্রতিজনকে সাজা প্রদানের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক জরিমানাও করেছিলেন।
আইনানুযায়ী বিচারিক আদালতের মূল রায় ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার নথি ও ডেথ রেফারেন্স পর্যালোচনার জন্য হাইকোর্টে পৌঁছে। একই সময়ে নিম্ন আদালতের প্রদত্ত সাজা ও মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মোট ১৩ জন আসামির মধ্যে যে ২ জন আসামি আপিল করেছিলেন, তাঁরা খালাস পান এবং আপিল না করা অপর ১১ জন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
উল্লেখ্য, বিগত ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন ১৮ দলীয় বিরোধী জোটের দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন ক্যাডার প্রকাশ্যে ও নির্মমভাবে কুপিয়ে খুন করে নিরীহ দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে। স্পর্শকাতর এই হত্যাকাণ্ডের পর ২০২৩ সালের ৫ মার্চ ছাত্রলীগের চিহ্নিত ২১ জন কর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে অভিযুক্ত এই ২১ জন আসামির মধ্যে মাত্র ৮ জন বর্তমানে কারাগারে আটক আছেন এবং বাকিরা এখনো পলাতক রয়েছেন।
নিহত তরুণ বিশ্বজিৎ দাসের গ্রামের বাড়ি ছিল শরীয়তপুর জেলায় এবং তিনি পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকায় নিজের দর্জি দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।


























