দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর একটি বিরাট অংশ বর্তমানে মারাত্মক ও উদ্বেগজনক অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত মোট স্থাপনার প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশই নানা মাত্রার অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিয়মিত তদারকির অভাব এবং সংশ্লিষ্ট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করার ফলেই মূলত এই ঝুঁকি দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রকাশিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংস্থাটি গত ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দৈবচয়নের ভিত্তিতে মোট ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন ও স্থাপনা সশরীরে পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩১৬টি স্থাপনাকে সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সব মিলিয়ে বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯৩৮টিতে। অন্যদিকে, বাকি ৬ হাজার ৫৯৫টি স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সন্তোষজনক বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফায়ার সার্ভিসের এই জরিপে উঠে আসা চিত্রের চেয়েও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভবন নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। তাছাড়া নির্মাণের পর অনেক ভবনে অবৈধ পরিবর্তন আনা হয়। অধিকাংশ ভবনেই পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্র্যান্ট, আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর বা আগুন শনাক্তকারী সেন্সর, ফায়ার ডোর এবং জরুরি বহির্গমন পথের সুব্যবস্থা থাকে না। তাঁর মতে, শুধু রাজধানী ঢাকার প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভবনই আজ নানা মাত্রার অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবাসিক ভবন, পোশাক কারখানা, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, শপিংমল ও রাসায়নিক গুদাম—প্রতিটি খাতের স্থাপনাতেই অগ্নিনিরাপত্তার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। পরিদর্শনকৃত ১ হাজার ৫৩টি হাসপাতালের মধ্যে ৫০৮টি (৪৮.২৪%) এবং ৪৮০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের মতো আকস্মিক দুর্ঘটনায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন দুর্বল, বৃদ্ধ ও শিশুদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় এসব স্থানে ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই পাঁচ মাস অগ্নিকাণ্ডের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেই চলেছে। গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। এর আগে আশুলিয়া ও গাজীপুরের বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় এবং টঙ্গী ও গাজীপুরের ওষুধ কারখানায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের সমীক্ষায় দেখা গেছে, পোশাক খাতের বাইরে উৎপাদনমুখী অন্যান্য কারখানার একটি বড় অংশ এবং রাসায়নিক গুদামগুলোর প্রায় ৮৮ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা কিংবা টঙ্গীর টাম্পাকো কারখানার মতো মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিগুলোর নেপথ্যেও এই দাহ্য রাসায়নিকের অবৈধ মজুত ও নিরাপত্তা ঘাটতি দায়ী ছিল। এছাড়া বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন শপিংমল ও রেস্টুরেন্টের নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫টি করে আগুন লাগার রেকর্ড রয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ৮৫ জনের প্রাণহানি এবং ২৬৭ জন আহত হয়েছেন। মোট অগ্নিকাণ্ডের বড় একটি অংশ—প্রায় ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ বা ৯ হাজার ৩৯২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে স্রেফ বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে। এছাড়া রান্নার চুলা, গ্যাস সিলিন্ডার ও বিড়ি-সিগনেটের জ্বলন্ত অংশ থেকেও বহু অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে।
কক্সবাজারের সাম্প্রতিক আলোচিত রিসোর্টটিতেও এর আগে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স না থাকা এবং অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ধরনের প্রাণহানি এড়ানো যায়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কেবল নোটিশ প্রদান বা দায়সারা পরিদর্শন নয়, বরং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জনসংযোগ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করার পর সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান, নোটিশ জারি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জনস্বার্থে এই তদারকি আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।






















