ইরানের অশান্ত ও গোলযোগপূর্ণ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান-বালুচেস্তান প্রদেশে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) পৃথক দুটি সশস্ত্র হামলায় আধাসামরিক বাহিনীর এক নারী কমান্ডার এবং একজন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।
সমগ্র অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে অবনতি হওয়া এবং ক্রমাগত সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতায় এই নতুন গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। এ অঞ্চলে সম্প্রতি বোমাবাজি, বন্দুকযুদ্ধ ও সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মেহরেস্তান শহরে নিজ বাসভবনের বাইরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বাসিজ ফোর্সের নারী ব্রিগেডের কমান্ডার আফসানেহ আঘিলা। তবে কোন সশস্ত্র সংগঠন বা কারা এই হামলার পেছনে দায়ী, সে সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, বাসিজ মূলত আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণাধীন একটি স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী। রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও আন্দোলন দমনে এই বাহিনীর সদস্যরা সম্মুখ সারিতে ভূমিকা পালন করে থাকেন। বাসিজের নারী ব্রিগেড বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচি ও শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভারী ও হালকা অস্ত্র পরিচালনার কৌশলগত প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে।
একই দিনে মেহরেস্তান শহরে একটি পুলিশি টহল ভ্যানকে লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলা চালায় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মোহাম্মদ-আলি শাহরিয়ারি নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে নারী বাসিজ কমান্ডার আফসানেহ আঘিলাকে হত্যার সাথে পুলিশ ভ্যানে হামলার কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন।
অন্যদিকে, ওই অঞ্চলে সক্রিয় থাকা সুন্নি মতাদর্শী জিহাদি ও বেলুচ জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘জৈশ আল-আদল’ তাদের নিজস্ব বার্তা মাধ্যম টেলিগ্রাম চ্যানেলে দাবি করেছে যে, বিগত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তাফতান পাহাড়ি এলাকা, কুরিন প্রশাসনিক অঞ্চল ও কৌশলগত চাবাহার সমুদ্রবন্দর এলাকায় ইরানি সামরিক বাহিনীর সাথে তাদের অন্তত তিন দফা মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটেছে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া সিস্তান-বালুচেস্তান মূলত সুন্নি মতাবলম্বী সংখ্যালঘু বেলুচ জনগোষ্ঠীর প্রধান বসতিস্থল। সুদীর্ঘ সময় ধরে এলাকাটি মৌলিক অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং তীব্র কর্মসংস্থান সংকটে জর্জরিত। গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকে অঞ্চলটিতে দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ঝটিকা হামলা, উচ্চমাত্রার বিস্ফোরণ এবং গুপ্তহত্যার প্রবণতা অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে।
স্থানীয় সুন্নি ও বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এমন আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করার পেছনে মূল কারণ এখনো অস্পষ্ট। তবে তেহরান সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে, এসব সশস্ত্র দলগুলোর পেছনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোপন গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি মদদ ও অর্থায়ন রয়েছে। যদিও নিজেদের এই দাবির সপক্ষে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ উপস্থাপন করেনি।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সমগ্র এলাকা জুড়ে ব্যাপক সামরিক অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে গত রোববার ‘জৈশ আল-আদল’ গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এক বেলুচ যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।























