নওগাঁ জেলাধীন রাণীনগর উপজেলায় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা খরচ ধরে শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম এবং কটু মানের সামগ্রী ব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ সামনে এসেছে। পথটির টেকসই ভিত্তি বা বেসমেন্ট যথাযথভাবে মজবুত না করেই তাড়াহুড়ো করে তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে চরম অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। সেই সাথে নথিপত্রে উল্লিখিত রাস্তার নির্ধারিত চওড়া বা প্রশস্ততা বজায় না রাখা নিয়েও মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তবে উন্নয়নমূলক এ কাজের চরম বেহাল দশা নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি দপ্তরের সুনির্দিষ্ট নজরদারির অভাব রয়েছে বলে সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাণীনগরের নলপুকুর এলাকা হতে শুরু হয়ে কসবাপাড়া অভিমুখে চলে যাওয়া মোট ১ হাজার ২১০ মিটার দীর্ঘ সড়ক পুনর্নির্মাণের জন্যে সর্বমোট ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার প্রশাসনিক বাজেট বরাদ্দ করা হয়। উক্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার সার্বিক ঠিকাদারি কার্যাদেশ লাভ করেছে ‘মেসার্স তৃষ্ণা স্টুডিও’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। চলতি ২০২৬ সনের গত ১৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই উন্নয়নমূলক প্রজেক্টটি আগামী ২০২৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গভাবে সমাপ্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে এলাকাভিত্তিক অধিবাসীদের চরম ক্ষোভের মূল কারণ হলো, নির্ধারিত সময়ের আগে তড়িৎগতিতে কাজ শেষ করতে গিয়ে রাস্তার দুই ধারের বহুমুখী অংশে কাদাটে নরম ইট ও নিকৃষ্ট মানের ইটের গুঁড়ো বা খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ঢালাই ও রোলার কাজের স্বার্থে প্রস্তুত করা খোয়া-বালুর মিশ্রণে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালুর ভাগ অতিরিক্ত মাত্রায় যোগ করা হচ্ছে। যার ফলে কোটি টাকা ব্যয়ের এই সংযোগ সড়কটির ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়ে তীব্র সংশয় আর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এ পথটি যদি দ্রুত ধসে বা ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়, তবে আগামী দিনে স্থানীয় যাতায়াতকারীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হবে।
প্রকল্প এলাকা ডাকাহারের অধিবাসী জমসেদ (যিনি পেলু নামে পরিচিত) আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, ‘সড়কের দুই পাশে যে অতি দুর্বল ও নরম মানের ইট গাঁথা হচ্ছে, সেগুলোর ওপর দিয়ে একটি যাত্রীবাহী সাধারণ ভ্যান গাড়ি চলাচল করলেই ইট ভেঙে একবারে ইটের গুঁড়োয় পরিণত হয়ে যাচ্ছে! তদুপরি রাস্তার প্রশস্ততা মেপে দেখলে মনে হয় কাঙ্ক্ষিত মাপের চেয়ে বেশ কিছুটা কম রাখা হচ্ছে। এই পথটি যদি টেকসইভাবে নির্মাণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সীমাহীন কষ্টে দিন কাটাতে হবে।’
মোয়াজ্জেম নামের অপর এক বাসিন্দা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় মন্তব্য করেন, ‘ঐভাবে অধিক পরিমাণের বালু আর অত্যন্ত বাজে মানের ইট দিয়ে পথ তৈরি করলে মাত্র দুই-তিন মাসের মধ্যেই তা পুনরায় ভেঙেচুরে বরবাদ হয়ে যাবে। কোনোমতে মান ঠিক না রেখে কেবল দ্রুত কাজ গুটিয়ে কেটে পড়ার চিন্তাভাবনা একদমই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
এ ছাড়া নলপুকুর গায়ের বাসিন্দা ফিরোজ হোসেন বেশ আক্ষেপের সাথে বলেন, ‘চলমান কাজের যে বেহাল দশা দেখতে পাচ্ছি, তাতে ইটের খোয়ার চেয়ে সাধারণ বালুর পরিমাণই চোখে বেশি পড়ছে! এইভাবে তড়িঘড়ি করে দায়িত্ব শেষ করতে চাইলে কয়েক মাসের ভেতরে পুরো সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এত জঘন্য মানের কাজ চালানো হলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষ হতে কোনো ধরনের তদারকি বা নজরদারি চোখে পড়ছে না।’
কাজের প্রশাসনিক দেখাশোনার দায়িত্বে নিযুক্ত ঠিকাদারি সংস্থার নিয়োজিত প্রতিনিধি গুলজার রহমান এ বিষয়ে নিজের সাফাই গেয়ে মন্তব্য করেন, ‘ভাটার মালিকপক্ষ থেকে ইট পাঠানোর সময় ভালো ইটের সাথে দু-চারটা খারাপ ইট গোপনে মিশিয়ে পাঠিয়ে দেয়, সেখানে আমাদের দলের কী অন্যায় থাকতে পারে? তাছাড়া বর্তমান সময়ে উপযুক্ত মানের ভালো ইট পাওয়ার অনুকূল মৌসুমও নয়। এরপরও বাজে কোনো ইট চোখে পড়লে তা আমরা সরাসরি ফেরৎ পাঠিয়ে দিচ্ছি, উপরন্তু এই গাফিলতির দরুন ইতোমধ্যে তিনজন কর্মীকে কাজ থেকে বের করে দিয়েছি।’
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আসল স্বত্বাধিকারী মারুফ সমস্ত অভিযোগ ঢালাওভাবে নাকচ করে দিয়ে দাবি করেন, ‘আমরা মোটেও নিম্নমানের উপাদান কিংবা বাজে ইট দিয়ে কাজ পরিচালনা করছি না। উত্থাপিত সব অভিযোগই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, আমরা পুরোপুরি মানসম্মত ও সুন্দর কাজ সম্পাদন করছি।’
পুরো বিষয়টি সম্পর্কে রাণীনগর উপজেলা এলজিইডি দপ্তরের দায়িত্বরত প্রকৌশলী শুভাশীষ রায় জানান, ‘আমাদের সরকারি দপ্তরের তরফ থেকে প্রতিটি মাঠপর্যায়ের কাজই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ ও তদারক করা হয়। তা সত্ত্বেও এই কাজের ক্রুটি বা অনিয়মের ব্যাপারে আপনারাই (সাংবাদিকেরা) আমাকে প্রথম অবহিত করলেন। যেহেতু প্রজেক্টটির কাজ এখনও সচল ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেহেতু সরেজমিন পরিদর্শনে কোনো প্রকার অসংগতি কিংবা গাইডওয়ালের কাজে গলদ বা ক্রুটি বিচ্যুতি ধরা পড়লে ঠিকাদারকে দিয়ে আবার নতুন করে তা পুরোপুরি সংশোধন করিয়ে নেওয়া হবে।’

























