আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে অতিরিক্ত চাপ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চরম অনিশ্চয়তা গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে অভ্যন্তরীণ কয়লাসম্পদ ব্যবহারের নীতিগত পরিকল্পনা জোরদার করছে সরকার। বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এ ক্ষেত্রে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনিকে প্রাথমিক অগ্রাধিকারে রেখে সামগ্রিক কার্যক্রম বিবেচনা করা হচ্ছে।
অফিসিয়াল সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পাঁচটি আবিষ্কৃত কয়লা খনিতে প্রায় ৭৮০ কোটি টন উচ্চমানের কয়লা মজুত রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কেবল দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনি ছাড়া অন্য কোনো স্থান থেকে কমার্শিয়াল কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে না। সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মতে, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কয়লা ব্যবহারে সক্ষম হলে জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল সাশ্রয় ঘটবে। একই সঙ্গে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ চাহিদার একটি বড় অংশ মেটানো সম্ভব হবে।
খনিবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, কেবল ফুলবাড়ী খনি থেকেই বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব। এর পাশাপাশি বড়পুকুরিয়া নর্থ অংশ থেকে ৬০ লাখ টন এবং দিঘিপাড়া খনি থেকে আরও ৩০ লাখ টন কয়লা প্রাপ্তির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে এই তিনটি খনি থেকেই বছরে গড়ে ২ কোটি ৪০ লাখ টন কয়লা উত্তোলনের বিশাল বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রশাসনিক ও কারিগরি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও প্রকৃতপক্ষে উত্তোলন কার্যক্রমে যেতে প্রায় পাঁচ থেকে আট বছর সময় লেগে যেতে পারে।
ফুলবাড়ী খনিটি প্রায় ১০ হাজার একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং উক্ত খনি এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। খনিটির পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো ও উত্তোলনের জন্য প্রায় ৪৮ বর্গকিলোমিটার ভূমির প্রত্যক্ষ প্রয়োজন হবে। ফলে খনি উন্নয়নের আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানান্তর, ন্যায্য ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণ এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সুনির্দিষ্ট সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণকে বিশেষজ্ঞগণ প্রধান শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, খোলা বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ফলে আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চলের উর্বর কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি বিদ্যমান। এর সাথে সাথে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দাকে স্থানান্তর করা হলে তাদের দীর্ঘমেযাদী জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই বড় আকারের উত্তোলনে নামার আগেই উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম. তামিম জানান, দেশীয় কয়লা উত্তোলনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পূর্বে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিস্তারিত কারিগরি ও সামাজিক সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি সীমিত এবং তা পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব হলেই কেবল উত্তোলনের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত হবে।
অপর এক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম মনে করেন, বৈদেশিক আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করতে নিজস্ব কয়লার ব্যবহার ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে উন্মুক্ত পদ্ধতির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ বা সুরঙ্গ পদ্ধতিতে সীমিত বা মাঝারি পরিসরে কয়লা উত্তোলনের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাও গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। কিন্তু এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় কয়লার প্রায় ৯৫ শতাংশই ইন্দোনেশিয়া সহ বিভিন্ন বিদেশ থেকে বিপুল খরচে আমদানি করতে হয়। ফলে মূল রপ্তানিকারক দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশ মারাত্মক জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়ে।
দেশের কয়লাসম্পদের ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কয়লা খনিগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থাপনাও প্রদান করা হয়েছে। সেখানে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দিঘিপাড়া খনির বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের পাশাপাশি জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ খনিতে নতুন সমীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, বর্তমান জাতীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিজস্ব খনিজ সম্পদ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে এবং পেট্রোবাংলা অন্যান্য সম্ভাব্য কয়লা খনি নিয়ে জোরালো কাজ শুরু করেছে।






















