বাংলাদেশের উদীয়মান পোশাকশিল্পে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে নেদারল্যান্ডস। গত সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভারে অবস্থিত টিম গ্রুপের অন্যতম অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্বমানের পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা ‘ফোরএ ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড’ সরাসরি ঘুরে দেখেন ডাচ আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক উপমন্ত্রী স্টিভেন কোলেট এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও উন্নয়ন প্রতিনিধিদল।
সফরকালে উপমন্ত্রী কারখানা প্রাঙ্গণে গৃহীত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিবেশবান্ধব উৎপাদন অবকাঠামো এবং শ্রমিকদের কল্যাণমুখী বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। একই সাথে টেকসই পোশাক উৎপাদন এবং বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
পরিদর্শনকালে নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধিদল টিম গ্রুপের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ইস্যুতে মতবিনিময় করেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), শিল্পক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণ, দায়িত্বশীল পণ্য সংগ্রহ বা সোর্সিং, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং ট্রেসেবিলিটি (উৎস্য শনাক্তকরণ) প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। তাছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের আসন্ন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনসংক্রান্ত কঠোর নীতিমালা কার্যকরভাবে মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়।
এর পাশাপাশি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড ও বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ সহায়তায় বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন সৌরশক্তি ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সার্কুলার বা পুনঃব্যবহারযোগ্য অর্থনীতি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) প্রবর্তন এবং কারখানা শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ মতবিনিময় করে।
পরিদর্শনকালে ডাচ উপমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেদারল্যান্ডসের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ রাষ্ট্রদূত ওয়াম্পি লিবন, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের মান্যবর রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেল, সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হেলাল হুসেইন, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সেলিম রেজা হাসান, ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার বাবলুর রহমান এবং অ্যাওয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মুইদ হাসান।
কারখানায় প্রতিনিধিদলটিকে উষ্ণ অর্ঘ্যে অভ্যর্থনা জানান টিম গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) আফরোজা শাহীন, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (উপব্যবস্থাপনা পরিচালক) আবদুল্লাহ হিল নাকিবসহ ফোরএ ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কারখানা চত্বর ঘুরে দেখার সময় বিদেশি প্রতিনিধিদলটি সামগ্রিক উৎপাদন লাইনের পাশাপাশি কারখানার সুউচ্চ ছাদে স্থাপিত বিশাল আধুনিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পুনঃব্যবহারের বিশেষ সঞ্চয়ব্যবস্থা, কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের সুবিধা্থে গঠিত ন্যায্যমূল্যের কেনাকাটার দোকান এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার) সহ নানাবিধ শ্রমিকবান্ধব সুযোগ-সুবিধা নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেন।
উল্লেখ্য, সাভারের ফোরএ ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড কারখানাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) মর্যাদাপূর্ণ ‘লিড প্লাটিনাম’ সনদপ্রাপ্ত একটি অন্যতম আধুনিক সবুজ পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রথম আউটারওয়্যার পোশাক প্রস্তুতকারক কারখানা হিসেবে সংস্থাটি জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি চার্টার ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিকভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কারখানার পরিবেশসম্মত বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে নেদারল্যান্ডসের উপমন্ত্রী স্টিভেন কোলেট বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ। তবে এই শিল্পের ভবিষ্যত প্রবৃদ্ধি বহুলাংশে নির্ভর করছে এমন সব দূরদর্শী কারখানার ওপর, যারা বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি সর্বাত্মক দায়িত্বশীল উৎপাদন নিশ্চিত করছে। ফোরএ ইয়ার্ন ডায়িং কারখানায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যেভাবে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা দেখে আমি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ও অভিভূত।’
বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস সম্পর্ক তুলে ধরে ডাচ উপমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের বহুমাত্রিক ও দীর্ঘদিনের যে বলিষ্ঠ অংশীদারত্ব রয়েছে, তাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করি। বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বস্ত্র ও পোশাক খাত গড়ে তুলতে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’
টিম গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আফরোজা শাহীন তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আরও নিরাপদ, আধুনিক, শ্রমিকবান্ধব ও সম্পূর্ণ পরিবেশসম্মত করে গড়ে তোলার দীর্ঘযাত্রায় নেদারল্যান্ডস সবসময় আমাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল কঠিন নীতিমালা এবং চলমান জ্বালানিসংকট আমাদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে—যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান আজ টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াবে, তারাই মূলত আগামী দিনের বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হবে। বাংলাদেশের পোশাক খাত যে আন্তর্জাতিক মানের সাফল্য অর্জন করতে পারে, তা এই বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পেরে আমরা গর্বিত। নেদারল্যান্ডসের সাথে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বকে আমরা সামনের দিনে আরও বহুদূর এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর।’


























