অবৈধ অভিবাসনের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে ইউরোপের বিশাল শ্রমবাজারে শতভাগ বৈধ, আন্তর্জাতিক মানের ও দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মানবপাচার কঠোরভাবে প্রতিরোধ, দক্ষ জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সামগ্রিক সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে ইইউর স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনারের নেতৃত্বে আগত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়।
পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অনুষ্ঠিত বৈঠকে অবৈধ অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক মানবপাচার প্রতিরোধ, বৈধ ও সঠিক উপায়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই নিরসনসহ দুই পক্ষের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানান যে, অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। জীবনঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে মানবপাচার রোধ করা এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতে ইইউর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে বর্তমান সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইইউ কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, মানবপাচার প্রতিরোধ করা এবং অবৈধ অভিবাসনের সকল পথ বন্ধ করা উভয় পক্ষেরই প্রধান অগ্রাধিকার। বাংলাদেশে অবৈধ অভিবাসনের হার হ্রাস পেলে ইউরোপের শ্রমবাজারে বৈধ ও দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার অনেক বেশি সহজ ও প্রসারিত হবে।
বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশি কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের বিষয়টি বৈঠকে প্রাধান্য পায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় সাড়ে সাতশ দক্ষ কর্মীদের ইউরোপীয় সনদপ্রাপ্তির বিদ্যমান জটিলতা কাটাতে ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি বাংলাদেশে এসে প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। ইইউ প্রতিনিধিদল সরকারের এই প্রস্তাবে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক সাড়া দিয়েছে।
এছাড়া, দেশের সকল বিমান, সমুদ্র ও স্থলবন্দরে যাত্রী চলাচল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘অ্যাডভান্সড প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন অ্যান্ড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালুর ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আধুনিক এই প্রযুক্তি ব্যবস্থাটি সরাসরি ইন্টারপোলের ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় বর্ডার অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সির (ফ্রন্টেক্স) সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার বিষয়েও বিশদ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
বৈঠকে দীর্ঘদিনের মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি মিয়ানমারের আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনার কারণে এই রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং পুরো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যই চরম হুমকি সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার স্বার্থে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও সশস্ত্র আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। ইইউ প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে যৌথ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করে।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, ডিরেক্টর হেনরিক নিলসেন, ক্যাবিনেট সদস্য গ্রিগোরিওস ডেলাভেকোরাস এবং ইইউর ডেপুটি হেড অব মিশন বাইবা জারিনা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আলোচনায় অংশ নেন।






















