চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ৪১টি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক উৎস থেকে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) হিসেবে রয়েছে ৪ হাজার ৭১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকায়।
গতকাল জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব আর্থিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। সংসদীয় কমিটির সভাপতি মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক কার্যক্রম, অগ্রগতি এবং বাজেট বরাদ্দের বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। তবে বাজেট ও প্রকল্পের অগ্রগতির পাশাপাশি গণশুনানি ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের তোপের মুখে পড়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
বৈঠকে উপস্থাপিত দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের হালনাগাদ চিত্রে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট; অথচ গ্যাস সংকটের কারণে এর বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট হলেও সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলসহ তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বৈঠকে জানানো হয়, আগামী ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেসব গ্রাহক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা (রুফটপ সোলার) স্থাপন করবেন, তাঁরা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের জন্য ১০ দশমিক ৫০ টাকা হারে আর্থিক ছাড় সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে দেশজুড়ে বাসাবাড়ির ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে বর্তমানে ঠিক কী পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালিত হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের কড়া সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
এদিকে দীর্ঘ ২৩ বছর পার হলেও আইন অনুযায়ী জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে গণশুনানি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনি প্রবিধান তৈরি না হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি চেয়েছেন কমিটির এক সদস্য। আরেক সদস্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা সরেজমিনে যাচাই এবং বছরের পর বছর ধরে প্রদান করা বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা নির্ধারণে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ‘ফরেনসিক অডিট’ পরিচালনার জোরালো দাবি জানান।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে উচ্চ আদালতের একটি সুস্পষ্ট রায় হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। সেই কমিটির মূল সুপারিশগুলো কী ছিল এবং তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে—তা আগামী বৈঠকে সংসদীয় কমিটিকে লিখিতভাবে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও সাধারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় আইনের বিধান মেনে কোনো গণশুনানি করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত অগ্রগতির তথ্যও বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে দিতে পারেননি বলে তিনি জানান।
কমিটির আরেক সদস্য মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিজেল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত জ্বালানি হলেও বর্তমানে দেশে এর মজুত রয়েছে মাত্র ৩১ দিনের। তিনি এই মজুত দ্রুত বাড়ানোর তাগিদ দেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অথচ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা অলস ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে সরকারি কোষাগার থেকে পরিশোধ করতে হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাঁরা জরুরি ফরেনসিক অডিটের দাবি জানিয়েছেন।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, রফিকুল ইসলাম হিলালী, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মমতাজ আলো, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) অংশ নেন।






















