বৈদেশিক কর্মসংস্থান, তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বজুড়ে অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে ওঠার দারুণ সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। এ জন্য সাময়িক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিবর্তে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সার্বিক আয় বৃদ্ধির সংমিশ্রণে জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবি যৌথ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের আঞ্চলিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব অভিমত তুলে ধরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনুষদ ও ‘অক্সফাম ইন এশিয়া’ যৌথভাবে ‘সবার জন্য এশিয়া: সরকারি সেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক এই বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আসন্ন বার্ষিক সভার প্রাক্কালে আয়োজিত এই সম্মেলনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বৈশ্বিক উন্নয়নকর্মীরা অংশ নেন।
‘অর্থনৈতিক সমতা অর্থায়ন: সরকারি সেবায় সম্পদ আহরণ’ শীর্ষক বিশেষ অধিবেশনে ড. তিতুমীর বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অর্জিত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিদ্যমান সংকটগুলো তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক করোনা মহামারি এবং পূর্ববর্তী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার নানা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশে নতুন করে আনুমানিক ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মুখে পড়েন। প্রচলিত সুরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে উঠতেই বর্তমান সরকার কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাকে সরাসরি যুক্ত করার পথ বেছে নিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ টেনে তিনি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরাসরি নারীদের অ্যাকাউন্টে অর্থ হস্তান্তরের (জিটুপি) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ উপকারভোগীকে আওতায় আনা সম্ভব হবে, যা দেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে আনবে। পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে যোগ্য কৃষকদের সরাসরি সহায়তা প্রদান করা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ০ দশমিক ৭ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগতি ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে ড. তিতুমীর সুনির্দিষ্ট ৬টি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি মূল্যের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য বিশেষ বহুপক্ষীয় তারল্য-সহায়তা তহবিল গঠন, খাদ্য ও সার আমদানিতে চালান গ্যারান্টি প্রদান, বড় সংকটের সময় আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত রাখা, উন্নত দেশের অব্যবহৃত এসডিআর পুনর্দণ্ডন, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সমবণ্টন এবং আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা।
সম্মেলনে অক্সফাম উপস্থাপিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়ার ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় আয়ের ৬০ থেকে ৭৭ শতাংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে, অন্যদিকে দরিদ্র ৫০ শতাংশ মানুষের আয় মাত্র ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে শতকোটিপতিদের সম্পদের ওপর ২ থেকে ৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপ করে সেই রাজস্ব দিয়ে এশিয়ার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বিশাল ঘাটি পূরণের সুপারিশ করা হয়।






















