বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দোরগোড়ায় সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ইউনিসেফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, পানির অপর নাম জীবন এবং পানি ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় পানি যদি কোনো কারণে দূষিত বা জীবাণুপূর্ণ হয়, তবে তা মানুষের জীবনরক্ষার পরিবর্তে মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান বিশ্বে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি জানান যে, দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার দৃঢ় সংকল্প নিয়েই আজকের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ড. আবদুল মঈন খান জানান যে, বাংলাদেশের নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ থাকলেও উজান থেকে বিভিন্ন নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে নদীগুলো দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মারাত্মক বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে—একদিকে যেমন দেশের উত্তরের জেলাগুলোতে মরুকরণ বা ডেজার্টিফিকেশনের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে এর দ্বিতীয় ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে। বাংলাদেশের নদনদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ার কারণে সমুদ্রের লবণাক্ত জলরাশি উপকূলীয় নদীগুলোর ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষ বিগত কয়েক দশক ধরে সুপেয় পানির তীব্র ও মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। দক্ষিণাঞ্চলের এই কষ্টকর বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন যে, এই সামগ্রিক বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে মানুষের মৌলিক অধিকার সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই মহৎ উদ্দেশ্যে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যৌথভাবে কাজ করার এবং এর সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা আজকের বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।
উক্ত বৈঠকে কেবল ইউনিসেফ নয়, বরং বিশ্বব্যাংক, ওয়াটারএইড এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রধানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। লিড মিনিস্ট্রি হিসেবে স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জনগণের মৌলিক জীবনযাত্রার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, আর সেই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত ও বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে মন্ত্রী জানান।
বৈদেশিক সহায়তা ও অর্থায়নের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন যে, বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুমুখী দাতা উভয় পক্ষের কাছ থেকেই যথেষ্ট পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে। তবে অতীতের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেই প্রাপ্ত সহায়তা সবসময় সঠিকভাবে বা যথাযথ খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতায় বিদেশি সহায়তার পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, বিশ্বের উন্নত ও ধনী দেশগুলো নিজেরাও বর্তমানে নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বাংলাদেশও এখনো পুরোপুরিভাবে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছাতে পারেনি, ফলে অর্থনৈতিক সূচকের বিচারে বাংলাদেশকে এক অর্থে এখনো গরিব দেশ হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএইড (USAID)-এর বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রায়ন এবং দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রদত্ত কোটি কোটি টাকার তহবিল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান যে, বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সহায়তার পরিমাণও বেশ খানিকটা কমে এসেছে, যা সার্বিক অর্থায়নে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
দেশের দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে ড. আবদুল মঈন খান বলেন যে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সরকার পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিগত ১৭ বছরে দেশের সাধারণ মানুষের রক্তঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত সম্পদ যে অপচয় ও চরম দুর্নীতির মাধ্যমে লুণ্ঠিত হয়েছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ইতোমধ্যে সেই লুণ্ঠন ও অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশ থেকে সমস্ত ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম চিরতরে দূর করে জনগণের অর্থ জনগণের প্রকৃত কল্যাণে সঠিকভাবে ব্যবহার করার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন যে, এই সুনির্দিষ্ট নীতি ও সুশাসনের ফলেই দেশের বর্তমান অর্থসংকট সফলভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়ের বিশদ বিবরণ দিয়ে মন্ত্রী জানান যে, নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার এই পরিকল্পনাটি এককভাবে কেবল ইউনিসেফের নয়, বরং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে এই প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। এই যৌথ প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ হবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে তিনি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।






















