সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক অস্বস্তি ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব পেছনে ফেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করেছে ঢাকা ও নয়া দিল্লি। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’-র একটি বিশেষ প্রতিবেদনে কূটনৈতিক সূত্র উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, আগামী নভেম্বর মাসের যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে এই সফর আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যার প্রভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাময়িক টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা দিল্লিতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তাকে হস্তান্তরের বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তাগিদ দেওয়া হলেও ভারত সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। ওই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনার মন্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলে বৈঠক অব্যাহত রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সম্ভাব্য বিষয়সূচি বা এজেন্ডা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে থমকে যাওয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করা এবং ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো এই বৈঠকের মূল আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
ইতিমধ্যেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭৬তম জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীও তাকে উষ্ণ ধন্যবাদ জানান। সফরসূচির বিষয়ে জানা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক ভ্রমণের পর অক্টোবর ও নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সূচি রয়েছে। এরই ফাঁকে সুবিধাজনক সময় দেখে দিল্লি সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই সফর সামনে রেখে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন। বৈঠকে পানিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এর আগে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের শীর্ষ নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ঢাকা কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক একটি নতুন কাঠামোয় পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ, যেখানে উপযুক্ত সময়ে দ্বিপক্ষীয় সফরকেই মূল অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অন্যদিকে চলতি মাসের শুরুতে দিল্লিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি দলীয় কর্মসূচি আয়োজনে ভারত সরকারের বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনোভাব হিসেবে বিবেচনা করছে ঢাকা।
দ্য হিন্দু তাদের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আচমকা পতন ভারতের অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হলেও বিএনপির জন্য তা ছিল পূর্বানুমানযোগ্য। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালীন সময়েও তারেক রহমান ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পরপরই, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে তিনি একজন প্রতিনিধি পাঠান। সেই সময়ই নয়া দিল্লি থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে হাসিনা সরকার আর বেশি দিন স্থায়ী হবে না।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শেখ হাসিনার শাসনকালেও বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের এই মাধ্যমটি কার্যকর ছিল।
২০২৪-এর নির্বাচনের মাত্র দুই মাস পূর্বে বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা ও বর্তমান জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দিল্লি সফর করেন। সে সময় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি স্পষ্ট সমর্থন জানাতে দিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৮ সালেও তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং হুমায়ুন কবিরের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। সেই সময় বিএনপির পূর্ববর্তী ভারতবিরোধী অবস্থানকে একটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর নীতি হিসেবে চিহ্নিত করে সম্পর্কের বরফ গালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।






















