Dhaka ০২:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

অভ্যন্তরীণ ঘাটতি বনাম বাণিজ্যিক উল্টোযাত্রা: ইলিশ রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপের প্রয়োজন

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৪:৫৪:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩০ বার দেখা হয়েছে

​একদা পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। আমাদের পদ্মা ও মেঘনার সুস্বাদু রূপালী ইলিশ সীমান্ত অতিক্রম করে স্থান পেত ওপার বাংলার বাজারে। বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ভারতে ইলিশ রপ্তানির সংবাদের সাথে জড়িয়ে থাকত এক ধরনের উৎসবের আমেজ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত চিত্রে দেখা গেছে এক বিপরীত বা উল্টো চিত্র। এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী ভারতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।


​এটি কেবল সাধারণ মৎস্য বাজারের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে আনুমানিক ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশের চালান এসে পৌঁছেছে। এই মাছের সিংহভাগই পরিবাহিত হয়েছে ভারতের গুজরাটের ভারুচ বন্দরের মাধ্যমে। ব্যবসায়িক সূত্রের খবর অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ আসার পথ উন্মুক্ত রয়েছে।


​যে মাছটিকে বাংলাদেশ কেবল নিজেদের জাতীয় মাছ হিসেবেই গণ্য করে না, বরং দেশের অর্থনীতি, খাদ্যরসিক বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক মনে করে—সেই ইলিশের এমন বাণিজ্যিক উল্টোযাত্রা একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রশ্নটি কেবল ‘ভারতের ইলিশ কেন বাংলাদেশে আসছে?’—তাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মূল চিন্তার বিষয় হলো দেশের নদীতে ইলিশের সরবরাহ এমন পর্যায়ে পৌঁছাল কেন যে ঘাটতি পূরণে বিদেশের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে?
​উৎপাদনের সরকারি পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে এই শঙ্কার পেছনের কারণ স্পষ্ট হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ আহরিত হয়েছিল ৫.৭১ লাখ মেট্রিক টন। তবে পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই সংখ্যা ৭.৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৫.২৯ লাখ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উৎপাদনের পরিমাণ আরও কমে এসে পৌঁছায় আনুমানিক ৫ লাখ টনে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশের মোট ইলিশ আহরণ প্রায় ৭১ হাজার টন কমে গেছে।


​উৎপাদনের এই ধারাবাহিক পতনকে কেবল একটি সাময়িক ওঠানামা বিবেচনা করে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ নদীর পানিতে ইলিশের উপস্থিতি শুধু একটি সাধারণ হিসাব নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ, লবণাক্ততার মাত্রা, ডিম ছাড়ার নিরাপদ পরিবেশ বা অভয়াশ্রমের সুরক্ষা, জাটকার বেঁচে থাকা, জেলেদের মাছ ধরার পদ্ধতি, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার সময়কাল নির্ধারণ এবং সর্বোপরি সমুদ্র ও নদীগুলোর বাস্তুতান্ত্রিক রূপান্তর।


​সাধারণ আবদ্ধ জলাশয়ের মাছের সাথে ইলিশের জীবনচক্র মেলালে চলবে না। এটি মূলত গভীর সমুদ্রের বাসিন্দা, যা ডিম ছাড়ার উদ্দেশ্যে নদীতে উঠে আসে এবং প্রজনন পর্ব শেষ করে আবার সমুদ্রে প্রত্যাবর্তন করে। বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীপ্রবাহের ওপর এদের জীবনচক্র সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় একে বন্দী রেখে এককভাবে সুরক্ষা দেওয়া অসম্ভব।


​এখানেই মুখ্য হয়ে ওঠে জাটকা নিধন বন্ধের বিষয়টি। ছোট জাটকাকে নদীতে নিরাপদে বড় হওয়ার সুযোগ না দিলে পূর্ণাঙ্গ ইলিশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ মহাজনি ঋণ, অভাব-অনটন, বাজারের চাহিদা ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের প্রভাবে অনেক জেলে আইনি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও জাটকা শিকারে লিপ্ত হন। ফলে যেসব ছোট মাছ ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়াতে পারত, তা আগেই বাজারজাত হয়ে হারিয়ে যায়।


​জাটকা সুরক্ষায় দেশে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৫ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের যেকোনো জাটকা ধরা, বিক্রি, সংরক্ষণ ও পরিবহন সম্পূর্ণরূপে আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তদুপরি, নির্ধারিত অভয়াশ্রমগুলোতে মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাস মাছ ধরা স্থগিত থাকে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে মেঘনা নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সকল ধরনের মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।


​নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও এটি কতটা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ হ্রাস, পলি জমা, পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনের কারণে ইলিশের ডিম ছাড়ার এলাকা ও সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বহু বছর পূর্বে নির্ধারিত কালপঞ্জি অনুযায়ী একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা জারি রাখলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা না-ও মিলতে পারে।


​এর পাশাপাশি বড় বাধা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার সময়সূচির অমিল। বাংলাদেশ যখন নিজেদের নদী ও সমুদ্রসীমায় মাছ ধরা বন্ধ রাখে, তখন ওপারের জলসীমায় একই বিধিনিষেধ কার্যকর না থাকলে সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যাহত হয়। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের সামুদ্রিক এলাকায় সাধারণত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ থাকে, যা বাংলাদেশের নির্ধারিত সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার সময়সূচির সাথে পুরোপুরি মেলে না। সীমান্ত না জানা ইলিশ একপাশে রক্ষা পেলেও অপর পাশের ট্রলারে ধরা পড়ে যায়।


​অতএব, ইলিশের এই সংকট কাটাতে ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একযোগে কাজ করার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। উভয় দেশের মৎস্য বিজ্ঞানী, নদী গবেষক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও জেলে প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘যৌথ ইলিশ ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ গঠন করা প্রয়োজন। একই সাথে নিষেধাজ্ঞার সময় বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবছর পর্যালোচনা করা এবং তা দুই দেশে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা দরকার।


​পাশাপাশি জেলেদের সামাজিক সুরক্ষার দিকটি সুনিশ্চিত করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে ভিজিএফ চাল বণ্টনের অনিয়ম দূর করে নগদ অর্থ, খাদ্য সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন তারা পেটের দায়ে বা ঋণের চাপে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে যেতে বাধ্য না হন।


​আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল প্রান্তিক জেলেকে দায়ী না করে অবৈধ মাছ ব্যবসার পেছনের আড়তদার, পরিবহনকারী ও মহাজনদের নজরদারির আওতায় আনতে হবে। অভয়াশ্রমে নৌযান পর্যবেক্ষণ, জেলেদের নিবন্ধীকরণ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্যনির্ভর অভিযান চালানো প্রয়োজন। সেই সাথে নদী দূষণ দূর করা ও নাব্যতা বজায় রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
​ভারতের গুজরাট থেকে আসা মাছ সাময়িকভাবে বাজারের চাহিদা মেটাতে পারে, কিন্তু নিজেদের নদীপ্রবাহে ইলিশের স্বাভাবিক প্রাচুর্য ফেরাতে না পারলে তা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় ক্ষতি ডেকে আনবে। এই উল্টো যাত্রা থামানোর লড়াইটি কেবল একটি মাছকে রক্ষা করার লড়াই নয়, এটি আমাদের নদী, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নদীমাতৃক দেশের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।

জনপ্রিয়

বিভাজনের রাজনীতি নয়, ঐক্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান চায় মার্কিন জনগণ: বারাক ওবামা

অভ্যন্তরীণ ঘাটতি বনাম বাণিজ্যিক উল্টোযাত্রা: ইলিশ রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপের প্রয়োজন

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৪:৫৪:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​একদা পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। আমাদের পদ্মা ও মেঘনার সুস্বাদু রূপালী ইলিশ সীমান্ত অতিক্রম করে স্থান পেত ওপার বাংলার বাজারে। বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ভারতে ইলিশ রপ্তানির সংবাদের সাথে জড়িয়ে থাকত এক ধরনের উৎসবের আমেজ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত চিত্রে দেখা গেছে এক বিপরীত বা উল্টো চিত্র। এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী ভারতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।


​এটি কেবল সাধারণ মৎস্য বাজারের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে আনুমানিক ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশের চালান এসে পৌঁছেছে। এই মাছের সিংহভাগই পরিবাহিত হয়েছে ভারতের গুজরাটের ভারুচ বন্দরের মাধ্যমে। ব্যবসায়িক সূত্রের খবর অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ আসার পথ উন্মুক্ত রয়েছে।


​যে মাছটিকে বাংলাদেশ কেবল নিজেদের জাতীয় মাছ হিসেবেই গণ্য করে না, বরং দেশের অর্থনীতি, খাদ্যরসিক বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক মনে করে—সেই ইলিশের এমন বাণিজ্যিক উল্টোযাত্রা একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রশ্নটি কেবল ‘ভারতের ইলিশ কেন বাংলাদেশে আসছে?’—তাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মূল চিন্তার বিষয় হলো দেশের নদীতে ইলিশের সরবরাহ এমন পর্যায়ে পৌঁছাল কেন যে ঘাটতি পূরণে বিদেশের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে?
​উৎপাদনের সরকারি পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে এই শঙ্কার পেছনের কারণ স্পষ্ট হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ আহরিত হয়েছিল ৫.৭১ লাখ মেট্রিক টন। তবে পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই সংখ্যা ৭.৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৫.২৯ লাখ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উৎপাদনের পরিমাণ আরও কমে এসে পৌঁছায় আনুমানিক ৫ লাখ টনে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশের মোট ইলিশ আহরণ প্রায় ৭১ হাজার টন কমে গেছে।


​উৎপাদনের এই ধারাবাহিক পতনকে কেবল একটি সাময়িক ওঠানামা বিবেচনা করে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ নদীর পানিতে ইলিশের উপস্থিতি শুধু একটি সাধারণ হিসাব নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ, লবণাক্ততার মাত্রা, ডিম ছাড়ার নিরাপদ পরিবেশ বা অভয়াশ্রমের সুরক্ষা, জাটকার বেঁচে থাকা, জেলেদের মাছ ধরার পদ্ধতি, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার সময়কাল নির্ধারণ এবং সর্বোপরি সমুদ্র ও নদীগুলোর বাস্তুতান্ত্রিক রূপান্তর।


​সাধারণ আবদ্ধ জলাশয়ের মাছের সাথে ইলিশের জীবনচক্র মেলালে চলবে না। এটি মূলত গভীর সমুদ্রের বাসিন্দা, যা ডিম ছাড়ার উদ্দেশ্যে নদীতে উঠে আসে এবং প্রজনন পর্ব শেষ করে আবার সমুদ্রে প্রত্যাবর্তন করে। বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীপ্রবাহের ওপর এদের জীবনচক্র সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় একে বন্দী রেখে এককভাবে সুরক্ষা দেওয়া অসম্ভব।


​এখানেই মুখ্য হয়ে ওঠে জাটকা নিধন বন্ধের বিষয়টি। ছোট জাটকাকে নদীতে নিরাপদে বড় হওয়ার সুযোগ না দিলে পূর্ণাঙ্গ ইলিশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ মহাজনি ঋণ, অভাব-অনটন, বাজারের চাহিদা ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের প্রভাবে অনেক জেলে আইনি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও জাটকা শিকারে লিপ্ত হন। ফলে যেসব ছোট মাছ ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়াতে পারত, তা আগেই বাজারজাত হয়ে হারিয়ে যায়।


​জাটকা সুরক্ষায় দেশে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৫ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের যেকোনো জাটকা ধরা, বিক্রি, সংরক্ষণ ও পরিবহন সম্পূর্ণরূপে আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তদুপরি, নির্ধারিত অভয়াশ্রমগুলোতে মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাস মাছ ধরা স্থগিত থাকে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে মেঘনা নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সকল ধরনের মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।


​নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও এটি কতটা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ হ্রাস, পলি জমা, পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনের কারণে ইলিশের ডিম ছাড়ার এলাকা ও সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বহু বছর পূর্বে নির্ধারিত কালপঞ্জি অনুযায়ী একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা জারি রাখলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা না-ও মিলতে পারে।


​এর পাশাপাশি বড় বাধা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার সময়সূচির অমিল। বাংলাদেশ যখন নিজেদের নদী ও সমুদ্রসীমায় মাছ ধরা বন্ধ রাখে, তখন ওপারের জলসীমায় একই বিধিনিষেধ কার্যকর না থাকলে সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যাহত হয়। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের সামুদ্রিক এলাকায় সাধারণত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ থাকে, যা বাংলাদেশের নির্ধারিত সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার সময়সূচির সাথে পুরোপুরি মেলে না। সীমান্ত না জানা ইলিশ একপাশে রক্ষা পেলেও অপর পাশের ট্রলারে ধরা পড়ে যায়।


​অতএব, ইলিশের এই সংকট কাটাতে ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একযোগে কাজ করার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। উভয় দেশের মৎস্য বিজ্ঞানী, নদী গবেষক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও জেলে প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘যৌথ ইলিশ ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ গঠন করা প্রয়োজন। একই সাথে নিষেধাজ্ঞার সময় বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবছর পর্যালোচনা করা এবং তা দুই দেশে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা দরকার।


​পাশাপাশি জেলেদের সামাজিক সুরক্ষার দিকটি সুনিশ্চিত করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে ভিজিএফ চাল বণ্টনের অনিয়ম দূর করে নগদ অর্থ, খাদ্য সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন তারা পেটের দায়ে বা ঋণের চাপে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে যেতে বাধ্য না হন।


​আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল প্রান্তিক জেলেকে দায়ী না করে অবৈধ মাছ ব্যবসার পেছনের আড়তদার, পরিবহনকারী ও মহাজনদের নজরদারির আওতায় আনতে হবে। অভয়াশ্রমে নৌযান পর্যবেক্ষণ, জেলেদের নিবন্ধীকরণ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্যনির্ভর অভিযান চালানো প্রয়োজন। সেই সাথে নদী দূষণ দূর করা ও নাব্যতা বজায় রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
​ভারতের গুজরাট থেকে আসা মাছ সাময়িকভাবে বাজারের চাহিদা মেটাতে পারে, কিন্তু নিজেদের নদীপ্রবাহে ইলিশের স্বাভাবিক প্রাচুর্য ফেরাতে না পারলে তা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় ক্ষতি ডেকে আনবে। এই উল্টো যাত্রা থামানোর লড়াইটি কেবল একটি মাছকে রক্ষা করার লড়াই নয়, এটি আমাদের নদী, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নদীমাতৃক দেশের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।