Dhaka ০১:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও-১ ও সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত ২ সংসদ সদস্যের শপথগ্রহণ আজ

আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার আগেই ডিজিটাল জনমত ও মিডিয়া ট্রায়ালের প্রবণতা

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৫:০৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪৬ বার দেখা হয়েছে

একজন মানুষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠল। একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। একটি ছবি প্রকাশ পেল। একটি ফোনালাপের অডিও সামনে এলো। কেউ একটি পোস্ট লিখল—“দেখুন, আসল চেহারা বেরিয়ে গেছে!” তারপর শুরু হলো শেয়ার, কমেন্ট, নিন্দা, ব্যঙ্গ, কৌতূহল, গুজব এবং অসংখ্য অনুমান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আদালতে অভিযুক্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হয়ে গেলেন “অপরাধী”।

তারপর শুরু হলো চরিত্রহনন। কিন্তু আদালত কোথায়? প্রমাণ কোথায়? অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য কোথায়? একটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই হতে সময় লাগে; কিন্তু ডিজিটাল জনমতের আদালতে একজন মানুষের সামাজিক বিচার হয়ে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আইনগতভাবে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই আমরা কীভাবে একজন মানুষের সামাজিক মৃত্যু ঘটিয়ে দিচ্ছি? এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের একটি গভীর উদ্বেগের প্রশ্ন।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে “Character Assassination”, “Digital Mob Justice” এবং “Media Trial”—এই তিনটি প্রবণতা পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, কখনো কখনো সংবাদ, অভিযোগ, জনমত এবং বিচার—সবকিছুর সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হতে পারেন; কিন্তু মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে তাঁর চাকরি চলে যেতে পারে, সন্তানদের পড়াশোনা নষ্ট হতে পারে, পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তাঁর সামাজিক পরিচয় স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আদালত পরে তাঁকে নির্দোষ বললেও—ডিজিটাল আদালত কি তার রায় ফিরিয়ে নেয়? না, তা নেয় না।

অভিযোগ থেকে রায়—মাঝখানের বিচার কোথায়?

একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধের অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগ তদন্তের বিষয়। প্রমাণ যাচাইয়ের বিষয়। বিচার আদালতের বিষয়। আর সংবাদ মানুষের জানার অধিকার পূরণের বিষয়। কিন্তু Media Trial বা গণমাধ্যমে বিচার যখন শুরু হয়, তখন এই সীমারেখাগুলো ভেঙে যেতে থাকে। প্রথমে আসে অভিযোগ। তারপর আসে সংবাদ। তারপর আসে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম। তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা। তারপর মন্তব্যের ঝড়। তারপর “জনমতের আদালত”। এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ের আগেই সামাজিক রায় হয়ে যায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি হলো Presumption of Innocence—অর্থাৎ অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা। কিন্তু মিডিয়া ট্রায়ালের সংস্কৃতি অনেক সময় এই নীতিটিকে উল্টে দেয়

সংবাদ আর বিচার এক জিনিস নয়

গণমাধ্যমের দায়িত্ব অপরাধ লুকিয়ে রাখা নয়। বরং দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুরুতর অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অংশ। সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন অভিযোগকে প্রমাণের ভাষায়, সন্দেহকে সত্যের ভাষায় এবং তদন্তকে রায়ের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়।

একজন সাংবাদিক বলতে পারেন—“তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।” এটি একটি তথ্য। কিন্তু যদি বলা হয়—“তিনি অপরাধ করেছেন।” তাহলে সেটি একটি সিদ্ধান্ত—যা প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই পার্থক্যটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যই বিশাল।

ডিজিটাল জনতা: যেখানে সবাই বিচারক

আগে জনতার বিচার হতে সময় লাগত। এখন লাগে কয়েক মিনিট। একটি স্মার্টফোন, একটি Facebook post, একটি YouTube thumbnail—এগুলোই যথেষ্ট একটি ডিজিটাল জনতা তৈরি করতে। একজন মানুষ একা হয়তো এমন মন্তব্য করতেন না। কিন্তু হাজার মানুষের ভিড়ে তিনি অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন। এটাই Mob Psychology-এর ডিজিটাল রূপ। একজন বলে—“ওকে শাস্তি দেওয়া উচিত।”

আরেকজন বলে—“ওর আসল চরিত্র সবাইকে জানানো দরকার।” তৃতীয়জন পুরোনো একটি ছবি বের করে আনে। চতুর্থজন একটি অডিও প্রকাশ করে। পঞ্চমজন নিজের মতো করে একটি গল্প তৈরি করে। তারপর শত শত মানুষ সেই গল্পে নিজেদের মন্তব্য যোগ করে। এভাবে একটি অভিযোগ ধীরে ধীরে একটি “নিশ্চিত সত্যে” পরিণত হয়—যদিও তার পেছনে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা প্রমাণ নাও থাকতে পারে।

চরিত্রহনন: মিথ্যা দিয়ে নয়, অর্ধসত্য দিয়েও

চরিত্রহননের জন্য সবসময় সম্পূর্ণ মিথ্যার প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় একটি সত্য ঘটনা, তার সঙ্গে কিছু অর্ধসত্য, কিছু অনুমান এবং কিছু ইচ্ছাকৃত ব্যাখ্যা মিলিয়েই একজন মানুষের একটি নতুন “চরিত্র” তৈরি করা যায়। একটি পুরোনো ছবি বর্তমান ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো। এআই-এর অনৈতিক ব্যবহার বিষয়টিকে আরও ভয়াবহ করে দিয়েছে। এই ব্যাপারে আরও একটি ব্যক্তিগত কথোপকথনের কয়েক সেকেন্ডের অংশ প্রকাশ করা হলো। একটি দীর্ঘ ভিডিও থেকে একটি ছোট অংশ কেটে নেওয়া হলো। একটি বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হলো। তারপর বলা হলো—“দেখুন, মানুষটি আসলে কেমন!” এই “দেখুন” শব্দটির মধ্যেই কখনো কখনো চরিত্রহননের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে থাকে। কারণ মানুষ প্রমাণ দেখতে চায় না; সে চটুল এবং রসালো গল্পে অনেক বেশি আগ্রহী হয়।

কেন আমরা অন্যের দুর্দশা দেখতে এত আগ্রহী?

এখানে মানুষের মনস্তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ অন্যের সাফল্যের দিকে তাকায়, নিজের অবস্থান বিচার করে এবং সামাজিক তুলনা করে। একজন অত্যন্ত সফল, জনপ্রিয় বা ক্ষমতাবান মানুষের হঠাৎ দুর্দশা বা পতনের খবর তাই অনেকের মধ্যে অস্বাভাবিক কৌতূহল সৃষ্টি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানে Social Comparison, Confirmation Bias, Negativity Bias এবং Schadenfreude-এর মতো ধারণাগুলো মানুষের এই আচরণের কিছু দিক ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

কেউ হয়তো মনে মনে ভাবতে পারেন—“যাকে এতদিন আমার চেয়ে অনেক ওপরে মনে হতো, সেও তো শেষ পর্যন্ত সমস্যায় পড়েছে।” এখানে অন্যের পতন কখনো কখনো নিজের অপ্রাপ্তির সাময়িক ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার—অন্যের সম্মান নষ্ট হলে নিজের সম্মান বাড়ে না। অন্যের ব্যর্থতা নিজের সাফল্য তৈরি করে না।

তাছাড়া Social Media Reward System বিষয়টিকে আরও ভয়ংকর করে। এখানেই ডিজিটাল যুগের বিশেষত্ব। ঘটনা যেমনই হোক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের একটি পোস্ট তার মস্তিষ্কে একটি সামাজিক পুরস্কার পাওয়ার আশা তৈরি করে। ফলে ব্যক্তি মনে করে, “আমি যদি unusual কিছু ধারণ করি, মানুষ সেটা দেখবে।”

এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তনটি হলো—আগে মানুষ ঘটনার সাক্ষী হতো; এখন মানুষ অনেক সময় ঘটনার content creator হয়ে যায়। মানুষ নিজের কাছে তার এমন আচরণকে “আমি তো কিছু করছি না”, “শুধু ছবি বা ভিডিও করছি”, “অন্যরাও করছে” অথবা “ভিডিওটা মানুষকে সচেতন করবে”—এমন ধারণার মধ্যে রেখে বৈধতা দেয়। এখানে ব্যক্তির Moral Disengagement (নৈতিক বিচ্ছিন্নতা)-ও কাজ করে।

প্রতিশোধ যখন বিচারের পোশাক পরে

চরিত্রহননের আরেকটি বড় উৎস হলো প্রতিশোধ। কেউ অপমানিত হয়েছেন। কেউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়েছেন। কেউ কর্মক্ষেত্রে বিরোধে জড়িয়েছেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—“তাকে শিক্ষা দিতে হবে।” এখান থেকেই ব্যক্তিগত তথ্যের অস্ত্রীকরণ শুরু হতে পারে। তখন ব্যক্তিগত ছবি, ফোনালাপ, ব্যক্তিগত মেসেজ, স্ক্রিনশট—সবকিছু প্রমাণ হিসেবে প্রকাশ করা হতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—কোনো ব্যক্তি অন্যায় করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে, নাকি তার ব্যক্তিগত জীবন জনসমক্ষে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হবে? দুটি এক জিনিস নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এক নয়। অপরাধের বিচার আদালতের বিষয়। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কোনো বিচারব্যবস্থা নয়।

আমরা কখন মানুষকে “মানুষ” হিসেবে দেখা বন্ধ করি?

ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তনগুলোর একটি হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে “Content” হিসেবে দেখা। একজন মানুষ কাঁদছেন। কেউ তার ভিডিও করছে। কেউ সেটি পোস্ট করছে। হাজার মানুষ দেখছে। কেউ বিপদে পড়েছে, সাহায্য না করে মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত হচ্ছে। কেউ হাসছে। কেউ শেয়ার করছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি—পর্দার ওপাশের মানুষটি কোনো fictional character নয়। তার একটি পরিবার আছে, তার কর্মজীবন আছে। তার সামাজিক পরিচয় আছে এবং তারও মর্যাদা আছে।

আমাদের কাছে সেটি হয়তো মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। কিন্তু সেই ত্রিশ সেকেন্ড হয়তো অন্য একজন মানুষের জন্য সারাজীবনের বোঝা হয়ে থাকতে পারে। এখন একজন মানুষের কষ্ট আর শুধুমাত্র একটি মানবিক ঘটনা থাকে না; সেটি একটি দৃশ্যমান পণ্য (consumable content) হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে dehumanization বা মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি ডিজিটাল রূপ হিসেবে আলোচনা করা যায়। ব্যক্তি তখন আর পূর্ণ মানবিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং দেখার মতো কিছু হিসেবে প্রতিভাত হন। সে হয়তো বুঝতেই পারছে না যে Digital Distance তাকে Emotionally detach করছে।

সামনাসামনি একজন মানুষকে কাঁদতে দেখলে তার মুখ, চোখ, কণ্ঠ, শরীরের অভিব্যক্তি—সবকিছু আমাদের মানবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু মোবাইলের screen-এর মাধ্যমে ঐ মানুষটি যখন একটি image বা video object হয়ে যায়, তখন psychological distance বেড়ে যায়। ফলে মানবিক অনুভূতি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। এই পরিবর্তনটি অনেক ভয়াবহ।

“আমি তো শুধু দেখেছি”—এই যুক্তিও কি যথেষ্ট?

এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। যে ব্যক্তি একটি অপমানজনক ভিডিও তৈরি করে, সে একা সেটিকে ভাইরাল করতে পারে না। তার প্রয়োজন দর্শক, তার প্রয়োজন Share এবং তার প্রয়োজন Comment বা Reaction। আমরা অনেক সময় বলি—“আমি তো শুধু দেখেছি।” “আমি তো শেয়ার করিনি।” “আমি তো সমালোচনা করার জন্য দেখেছি।” কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতিতে View, Click একটি প্রতিক্রিয়া এবং Share তো আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ, কোনো কনটেন্টের নিন্দা করতে গিয়েও আমরা কখনো কখনো সেটির বিস্তার বাড়িয়ে দিতে পারি। চরিত্রহননের শক্তি শুধু যে ব্যক্তি অপমানজনক কনটেন্ট তৈরি করে তার হাতে থাকে না; দর্শকের সম্মিলিত কৌতূহলও তাকে শক্তি দেয়।

অ্যালগরিদম কি আমাদের বিচারক বানাচ্ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম মানুষের রাগ, কৌতূহল বা ঈর্ষা সৃষ্টি করেনি। কিন্তু মানুষের কোন আবেগকে কত দ্রুত কত মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়া হবে—সেখানে অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোস্ট বলছে—“আজ আমরা একটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে শান্তভাবে আলোচনা করি।” অন্য একটি পোস্ট বলছে—“দেখুন! এই ব্যক্তির ভয়ংকর কাণ্ড! সবাই শেয়ার করুন!” দ্বিতীয় পোস্টটি যদি বেশি মানুষ দেখে, বেশি মন্তব্য তৈরি করে, বেশি শেয়ার হয়—তাহলে অ্যালগরিদমের কারণে সেটি আরও বেশি দৃশ্যমান হয়।

এটাই অ্যালগরিদমের বৈশিষ্ট্য। ফলে অ্যালগরিদম অনেক ক্ষেত্রে মানুষের attention এবং engagement-কে অনুসরণ করে। এখানে প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক মডেল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এটি শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, এটি নৈতিকতার প্রশ্ন। এটি ব্যবসায়িক মডেলের প্রশ্ন। এটি গণমাধ্যমের প্রশ্ন। এবং সর্বোপরি—এটি মানুষের প্রশ্ন।

এর দায় কার?

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। শুধু ব্যবহারকারীকে দায়ী করেও হবে না। সমস্যাটি বরং একটি সহ-বিবর্তিত (co-evolved) সমস্যা—যেখানে মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রযুক্তির নকশা এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনা একে অপরকে শক্তিশালী করে।

ব্যবহারকারীর দায়িত্ব—তথ্য যাচাই করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং দায়িত্বশীলভাবে শেয়ার করা। বাংলাদেশের সংবিধানে বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার—দুইটিকেই মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ও সীমা নির্ধারণে বেশ কিছু বিশেষ আইন ও ক্ষেত্র রয়েছে। রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে এর ওপর “যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ” (Reasonable Restrictions) আরোপ করতে পারে।

দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860)-এর ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানি (Defamation) ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়াও অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত উপাত্ত, ছবি বা বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ (সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬)। এখন উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব—ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার সীমিত করা, কার্যকর মডারেশন নিশ্চিত করা এবং অ্যালগরিদমিক নীতিতে অধিক স্বচ্ছতা আনা।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব—অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন না করা এবং সংবাদ ও বিচারের সীমারেখা বজায় রাখা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এমন আইন ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষিত থাকে।

তবে কি অপরাধ প্রকাশ করা যাবে না?

অবশ্যই যাবে। এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ করতেই হবে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুরুতর অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা জনস্বার্থের বিষয় গোপন রাখা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এখানে ভারসাম্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বার্থে জবাবদিহি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তির মর্যাদা ও ন্যায্য বিচারও প্রয়োজন।

সাংবাদিকতার কাজ হলো সত্য অনুসন্ধান করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজ মানুষের কৌতূহলকে সীমাহীন জনতার বিচারে পরিণত করা নয়। আর নাগরিকের কাজ হলো তথ্যের ভিত্তিতে মত তৈরি করা—কিন্তু আদালতের ভূমিকা নিজের হাতে তুলে না নেওয়া।

একজন মানুষকে তার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়

সভ্য সমাজের একটি বড় পরীক্ষা হলো—সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। শক্তিশালী মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো সহজ। সফল মানুষের প্রশংসা করা সহজ। কিন্তু একজন মানুষ যখন ভুল করেছেন, অপমানিত হয়েছেন, কাঁদছেন অথবা দুর্বল অবস্থায় আছেন—তখনও তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারা মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।

আমাদের মনে রাখতে হবে—মানুষ ভুল করতে পারে। মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। মানুষ অপরাধও করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ, প্রমাণ এবং অপরাধ—এই তিনটি এক জিনিস নয়। কোনো ব্যক্তি সত্যিই অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু গুজব, অসম্পূর্ণ তথ্য, কাটা-ছেঁড়া ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনার ওপর ভিত্তি করে তার পরিবার, পেশা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। কখনো কখনো সেটি নিজেই আরেক ধরনের অন্যায়।

আমাদের সামনে এখন নতুন একটি নৈতিক প্রশ্ন

আগামী দিনের বড় প্রশ্ন শুধু “Digital Privacy” নয়। তার সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—ডিজিটাল মর্যাদা। একজন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক সুনাম, ব্যক্তিগত মুহূর্ত এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার কি ডিজিটাল পৃথিবীতেও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে? প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, এই প্রশ্ন তত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তাই কোনো ভিডিও দেখার আগে, কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে, কোনো অভিযোগ বিশ্বাস করার আগে আমাদের একটি প্রশ্ন করা দরকার—“এই মানুষটি যদি আমি হতাম?” আরও একটি—“এই ভিডিওটি যদি আমার সন্তানকে নিয়ে হতো?” আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—“আমি কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি, নাকি শুধু একটি জনতার অংশ হয়ে যাচ্ছি?”

শেষ কথা

ন্যায়বিচার দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দ্রুত রায় দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। সত্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সাংবাদিকতা নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রয়োজন। কিন্তু একজন মানুষকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া প্রতিবাদ নয়।

একটি মোবাইল ফোন দিয়ে আমরা একটি অন্যায় প্রকাশ করতে পারি। আবার একই মোবাইল ফোন দিয়ে একজন নির্দোষ মানুষের জীবনও বিপর্যস্ত করতে পারি। তাই প্রশ্নটি শুধু—“কে অপরাধী?” সেটা নয়, বরং প্রশ্নটি এখন—“আমরা কি ন্যায়বিচারের সমাজ তৈরি করছি, নাকি জনতার রায়ের সমাজ?”

কারণ আদালতের রায় একজন মানুষকে শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু জনতার রায় অনেক সময় একজন মানুষকে রায় ঘোষণার আগেই ধ্বংস করে দিতে পারে। আর যখন কোনো সমাজে অভিযোগ প্রমাণের আগে রায়ে পরিণত হয়, তখন শুধু একজন মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের সম্মিলিত বিশ্বাস।

লেখক : বর্তমানে Bangladesh Army International University of Science & Technology (BAIUST)-এর রেজিস্ট্রার এবং খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি।

জনপ্রিয়

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ বন্ধ থাকবে ২৪ ঘণ্টা, ডেসকোর জরুরি নির্দেশনা

আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার আগেই ডিজিটাল জনমত ও মিডিয়া ট্রায়ালের প্রবণতা

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৫:০৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একজন মানুষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠল। একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। একটি ছবি প্রকাশ পেল। একটি ফোনালাপের অডিও সামনে এলো। কেউ একটি পোস্ট লিখল—“দেখুন, আসল চেহারা বেরিয়ে গেছে!” তারপর শুরু হলো শেয়ার, কমেন্ট, নিন্দা, ব্যঙ্গ, কৌতূহল, গুজব এবং অসংখ্য অনুমান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আদালতে অভিযুক্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হয়ে গেলেন “অপরাধী”।

তারপর শুরু হলো চরিত্রহনন। কিন্তু আদালত কোথায়? প্রমাণ কোথায়? অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য কোথায়? একটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই হতে সময় লাগে; কিন্তু ডিজিটাল জনমতের আদালতে একজন মানুষের সামাজিক বিচার হয়ে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আইনগতভাবে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই আমরা কীভাবে একজন মানুষের সামাজিক মৃত্যু ঘটিয়ে দিচ্ছি? এটাই আমাদের বর্তমান সময়ের একটি গভীর উদ্বেগের প্রশ্ন।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে “Character Assassination”, “Digital Mob Justice” এবং “Media Trial”—এই তিনটি প্রবণতা পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, কখনো কখনো সংবাদ, অভিযোগ, জনমত এবং বিচার—সবকিছুর সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হতে পারেন; কিন্তু মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে তাঁর চাকরি চলে যেতে পারে, সন্তানদের পড়াশোনা নষ্ট হতে পারে, পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তাঁর সামাজিক পরিচয় স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আদালত পরে তাঁকে নির্দোষ বললেও—ডিজিটাল আদালত কি তার রায় ফিরিয়ে নেয়? না, তা নেয় না।

অভিযোগ থেকে রায়—মাঝখানের বিচার কোথায়?

একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধের অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগ তদন্তের বিষয়। প্রমাণ যাচাইয়ের বিষয়। বিচার আদালতের বিষয়। আর সংবাদ মানুষের জানার অধিকার পূরণের বিষয়। কিন্তু Media Trial বা গণমাধ্যমে বিচার যখন শুরু হয়, তখন এই সীমারেখাগুলো ভেঙে যেতে থাকে। প্রথমে আসে অভিযোগ। তারপর আসে সংবাদ। তারপর আসে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম। তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা। তারপর মন্তব্যের ঝড়। তারপর “জনমতের আদালত”। এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ের আগেই সামাজিক রায় হয়ে যায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি হলো Presumption of Innocence—অর্থাৎ অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা। কিন্তু মিডিয়া ট্রায়ালের সংস্কৃতি অনেক সময় এই নীতিটিকে উল্টে দেয়

সংবাদ আর বিচার এক জিনিস নয়

গণমাধ্যমের দায়িত্ব অপরাধ লুকিয়ে রাখা নয়। বরং দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুরুতর অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অংশ। সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন অভিযোগকে প্রমাণের ভাষায়, সন্দেহকে সত্যের ভাষায় এবং তদন্তকে রায়ের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়।

একজন সাংবাদিক বলতে পারেন—“তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।” এটি একটি তথ্য। কিন্তু যদি বলা হয়—“তিনি অপরাধ করেছেন।” তাহলে সেটি একটি সিদ্ধান্ত—যা প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই পার্থক্যটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যই বিশাল।

ডিজিটাল জনতা: যেখানে সবাই বিচারক

আগে জনতার বিচার হতে সময় লাগত। এখন লাগে কয়েক মিনিট। একটি স্মার্টফোন, একটি Facebook post, একটি YouTube thumbnail—এগুলোই যথেষ্ট একটি ডিজিটাল জনতা তৈরি করতে। একজন মানুষ একা হয়তো এমন মন্তব্য করতেন না। কিন্তু হাজার মানুষের ভিড়ে তিনি অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন। এটাই Mob Psychology-এর ডিজিটাল রূপ। একজন বলে—“ওকে শাস্তি দেওয়া উচিত।”

আরেকজন বলে—“ওর আসল চরিত্র সবাইকে জানানো দরকার।” তৃতীয়জন পুরোনো একটি ছবি বের করে আনে। চতুর্থজন একটি অডিও প্রকাশ করে। পঞ্চমজন নিজের মতো করে একটি গল্প তৈরি করে। তারপর শত শত মানুষ সেই গল্পে নিজেদের মন্তব্য যোগ করে। এভাবে একটি অভিযোগ ধীরে ধীরে একটি “নিশ্চিত সত্যে” পরিণত হয়—যদিও তার পেছনে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা প্রমাণ নাও থাকতে পারে।

চরিত্রহনন: মিথ্যা দিয়ে নয়, অর্ধসত্য দিয়েও

চরিত্রহননের জন্য সবসময় সম্পূর্ণ মিথ্যার প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় একটি সত্য ঘটনা, তার সঙ্গে কিছু অর্ধসত্য, কিছু অনুমান এবং কিছু ইচ্ছাকৃত ব্যাখ্যা মিলিয়েই একজন মানুষের একটি নতুন “চরিত্র” তৈরি করা যায়। একটি পুরোনো ছবি বর্তমান ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো। এআই-এর অনৈতিক ব্যবহার বিষয়টিকে আরও ভয়াবহ করে দিয়েছে। এই ব্যাপারে আরও একটি ব্যক্তিগত কথোপকথনের কয়েক সেকেন্ডের অংশ প্রকাশ করা হলো। একটি দীর্ঘ ভিডিও থেকে একটি ছোট অংশ কেটে নেওয়া হলো। একটি বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হলো। তারপর বলা হলো—“দেখুন, মানুষটি আসলে কেমন!” এই “দেখুন” শব্দটির মধ্যেই কখনো কখনো চরিত্রহননের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে থাকে। কারণ মানুষ প্রমাণ দেখতে চায় না; সে চটুল এবং রসালো গল্পে অনেক বেশি আগ্রহী হয়।

কেন আমরা অন্যের দুর্দশা দেখতে এত আগ্রহী?

এখানে মানুষের মনস্তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ অন্যের সাফল্যের দিকে তাকায়, নিজের অবস্থান বিচার করে এবং সামাজিক তুলনা করে। একজন অত্যন্ত সফল, জনপ্রিয় বা ক্ষমতাবান মানুষের হঠাৎ দুর্দশা বা পতনের খবর তাই অনেকের মধ্যে অস্বাভাবিক কৌতূহল সৃষ্টি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানে Social Comparison, Confirmation Bias, Negativity Bias এবং Schadenfreude-এর মতো ধারণাগুলো মানুষের এই আচরণের কিছু দিক ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

কেউ হয়তো মনে মনে ভাবতে পারেন—“যাকে এতদিন আমার চেয়ে অনেক ওপরে মনে হতো, সেও তো শেষ পর্যন্ত সমস্যায় পড়েছে।” এখানে অন্যের পতন কখনো কখনো নিজের অপ্রাপ্তির সাময়িক ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার—অন্যের সম্মান নষ্ট হলে নিজের সম্মান বাড়ে না। অন্যের ব্যর্থতা নিজের সাফল্য তৈরি করে না।

তাছাড়া Social Media Reward System বিষয়টিকে আরও ভয়ংকর করে। এখানেই ডিজিটাল যুগের বিশেষত্ব। ঘটনা যেমনই হোক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের একটি পোস্ট তার মস্তিষ্কে একটি সামাজিক পুরস্কার পাওয়ার আশা তৈরি করে। ফলে ব্যক্তি মনে করে, “আমি যদি unusual কিছু ধারণ করি, মানুষ সেটা দেখবে।”

এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তনটি হলো—আগে মানুষ ঘটনার সাক্ষী হতো; এখন মানুষ অনেক সময় ঘটনার content creator হয়ে যায়। মানুষ নিজের কাছে তার এমন আচরণকে “আমি তো কিছু করছি না”, “শুধু ছবি বা ভিডিও করছি”, “অন্যরাও করছে” অথবা “ভিডিওটা মানুষকে সচেতন করবে”—এমন ধারণার মধ্যে রেখে বৈধতা দেয়। এখানে ব্যক্তির Moral Disengagement (নৈতিক বিচ্ছিন্নতা)-ও কাজ করে।

প্রতিশোধ যখন বিচারের পোশাক পরে

চরিত্রহননের আরেকটি বড় উৎস হলো প্রতিশোধ। কেউ অপমানিত হয়েছেন। কেউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়েছেন। কেউ কর্মক্ষেত্রে বিরোধে জড়িয়েছেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—“তাকে শিক্ষা দিতে হবে।” এখান থেকেই ব্যক্তিগত তথ্যের অস্ত্রীকরণ শুরু হতে পারে। তখন ব্যক্তিগত ছবি, ফোনালাপ, ব্যক্তিগত মেসেজ, স্ক্রিনশট—সবকিছু প্রমাণ হিসেবে প্রকাশ করা হতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—কোনো ব্যক্তি অন্যায় করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে, নাকি তার ব্যক্তিগত জীবন জনসমক্ষে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হবে? দুটি এক জিনিস নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এক নয়। অপরাধের বিচার আদালতের বিষয়। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কোনো বিচারব্যবস্থা নয়।

আমরা কখন মানুষকে “মানুষ” হিসেবে দেখা বন্ধ করি?

ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তনগুলোর একটি হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে “Content” হিসেবে দেখা। একজন মানুষ কাঁদছেন। কেউ তার ভিডিও করছে। কেউ সেটি পোস্ট করছে। হাজার মানুষ দেখছে। কেউ বিপদে পড়েছে, সাহায্য না করে মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত হচ্ছে। কেউ হাসছে। কেউ শেয়ার করছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি—পর্দার ওপাশের মানুষটি কোনো fictional character নয়। তার একটি পরিবার আছে, তার কর্মজীবন আছে। তার সামাজিক পরিচয় আছে এবং তারও মর্যাদা আছে।

আমাদের কাছে সেটি হয়তো মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। কিন্তু সেই ত্রিশ সেকেন্ড হয়তো অন্য একজন মানুষের জন্য সারাজীবনের বোঝা হয়ে থাকতে পারে। এখন একজন মানুষের কষ্ট আর শুধুমাত্র একটি মানবিক ঘটনা থাকে না; সেটি একটি দৃশ্যমান পণ্য (consumable content) হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে dehumanization বা মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি ডিজিটাল রূপ হিসেবে আলোচনা করা যায়। ব্যক্তি তখন আর পূর্ণ মানবিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং দেখার মতো কিছু হিসেবে প্রতিভাত হন। সে হয়তো বুঝতেই পারছে না যে Digital Distance তাকে Emotionally detach করছে।

সামনাসামনি একজন মানুষকে কাঁদতে দেখলে তার মুখ, চোখ, কণ্ঠ, শরীরের অভিব্যক্তি—সবকিছু আমাদের মানবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু মোবাইলের screen-এর মাধ্যমে ঐ মানুষটি যখন একটি image বা video object হয়ে যায়, তখন psychological distance বেড়ে যায়। ফলে মানবিক অনুভূতি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। এই পরিবর্তনটি অনেক ভয়াবহ।

“আমি তো শুধু দেখেছি”—এই যুক্তিও কি যথেষ্ট?

এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। যে ব্যক্তি একটি অপমানজনক ভিডিও তৈরি করে, সে একা সেটিকে ভাইরাল করতে পারে না। তার প্রয়োজন দর্শক, তার প্রয়োজন Share এবং তার প্রয়োজন Comment বা Reaction। আমরা অনেক সময় বলি—“আমি তো শুধু দেখেছি।” “আমি তো শেয়ার করিনি।” “আমি তো সমালোচনা করার জন্য দেখেছি।” কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতিতে View, Click একটি প্রতিক্রিয়া এবং Share তো আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ, কোনো কনটেন্টের নিন্দা করতে গিয়েও আমরা কখনো কখনো সেটির বিস্তার বাড়িয়ে দিতে পারি। চরিত্রহননের শক্তি শুধু যে ব্যক্তি অপমানজনক কনটেন্ট তৈরি করে তার হাতে থাকে না; দর্শকের সম্মিলিত কৌতূহলও তাকে শক্তি দেয়।

অ্যালগরিদম কি আমাদের বিচারক বানাচ্ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম মানুষের রাগ, কৌতূহল বা ঈর্ষা সৃষ্টি করেনি। কিন্তু মানুষের কোন আবেগকে কত দ্রুত কত মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়া হবে—সেখানে অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোস্ট বলছে—“আজ আমরা একটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে শান্তভাবে আলোচনা করি।” অন্য একটি পোস্ট বলছে—“দেখুন! এই ব্যক্তির ভয়ংকর কাণ্ড! সবাই শেয়ার করুন!” দ্বিতীয় পোস্টটি যদি বেশি মানুষ দেখে, বেশি মন্তব্য তৈরি করে, বেশি শেয়ার হয়—তাহলে অ্যালগরিদমের কারণে সেটি আরও বেশি দৃশ্যমান হয়।

এটাই অ্যালগরিদমের বৈশিষ্ট্য। ফলে অ্যালগরিদম অনেক ক্ষেত্রে মানুষের attention এবং engagement-কে অনুসরণ করে। এখানে প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক মডেল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এটি শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, এটি নৈতিকতার প্রশ্ন। এটি ব্যবসায়িক মডেলের প্রশ্ন। এটি গণমাধ্যমের প্রশ্ন। এবং সর্বোপরি—এটি মানুষের প্রশ্ন।

এর দায় কার?

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। শুধু ব্যবহারকারীকে দায়ী করেও হবে না। সমস্যাটি বরং একটি সহ-বিবর্তিত (co-evolved) সমস্যা—যেখানে মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রযুক্তির নকশা এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনা একে অপরকে শক্তিশালী করে।

ব্যবহারকারীর দায়িত্ব—তথ্য যাচাই করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং দায়িত্বশীলভাবে শেয়ার করা। বাংলাদেশের সংবিধানে বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার—দুইটিকেই মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ও সীমা নির্ধারণে বেশ কিছু বিশেষ আইন ও ক্ষেত্র রয়েছে। রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে এর ওপর “যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ” (Reasonable Restrictions) আরোপ করতে পারে।

দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860)-এর ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানি (Defamation) ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়াও অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত উপাত্ত, ছবি বা বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ (সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬)। এখন উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব—ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার সীমিত করা, কার্যকর মডারেশন নিশ্চিত করা এবং অ্যালগরিদমিক নীতিতে অধিক স্বচ্ছতা আনা।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব—অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন না করা এবং সংবাদ ও বিচারের সীমারেখা বজায় রাখা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এমন আইন ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষিত থাকে।

তবে কি অপরাধ প্রকাশ করা যাবে না?

অবশ্যই যাবে। এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ করতেই হবে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুরুতর অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা জনস্বার্থের বিষয় গোপন রাখা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এখানে ভারসাম্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বার্থে জবাবদিহি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তির মর্যাদা ও ন্যায্য বিচারও প্রয়োজন।

সাংবাদিকতার কাজ হলো সত্য অনুসন্ধান করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজ মানুষের কৌতূহলকে সীমাহীন জনতার বিচারে পরিণত করা নয়। আর নাগরিকের কাজ হলো তথ্যের ভিত্তিতে মত তৈরি করা—কিন্তু আদালতের ভূমিকা নিজের হাতে তুলে না নেওয়া।

একজন মানুষকে তার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়

সভ্য সমাজের একটি বড় পরীক্ষা হলো—সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। শক্তিশালী মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো সহজ। সফল মানুষের প্রশংসা করা সহজ। কিন্তু একজন মানুষ যখন ভুল করেছেন, অপমানিত হয়েছেন, কাঁদছেন অথবা দুর্বল অবস্থায় আছেন—তখনও তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারা মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।

আমাদের মনে রাখতে হবে—মানুষ ভুল করতে পারে। মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। মানুষ অপরাধও করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ, প্রমাণ এবং অপরাধ—এই তিনটি এক জিনিস নয়। কোনো ব্যক্তি সত্যিই অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু গুজব, অসম্পূর্ণ তথ্য, কাটা-ছেঁড়া ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনার ওপর ভিত্তি করে তার পরিবার, পেশা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। কখনো কখনো সেটি নিজেই আরেক ধরনের অন্যায়।

আমাদের সামনে এখন নতুন একটি নৈতিক প্রশ্ন

আগামী দিনের বড় প্রশ্ন শুধু “Digital Privacy” নয়। তার সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—ডিজিটাল মর্যাদা। একজন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক সুনাম, ব্যক্তিগত মুহূর্ত এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার কি ডিজিটাল পৃথিবীতেও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে? প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, এই প্রশ্ন তত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তাই কোনো ভিডিও দেখার আগে, কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে, কোনো অভিযোগ বিশ্বাস করার আগে আমাদের একটি প্রশ্ন করা দরকার—“এই মানুষটি যদি আমি হতাম?” আরও একটি—“এই ভিডিওটি যদি আমার সন্তানকে নিয়ে হতো?” আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—“আমি কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি, নাকি শুধু একটি জনতার অংশ হয়ে যাচ্ছি?”

শেষ কথা

ন্যায়বিচার দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দ্রুত রায় দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। সত্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সাংবাদিকতা নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রয়োজন। কিন্তু একজন মানুষকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া প্রতিবাদ নয়।

একটি মোবাইল ফোন দিয়ে আমরা একটি অন্যায় প্রকাশ করতে পারি। আবার একই মোবাইল ফোন দিয়ে একজন নির্দোষ মানুষের জীবনও বিপর্যস্ত করতে পারি। তাই প্রশ্নটি শুধু—“কে অপরাধী?” সেটা নয়, বরং প্রশ্নটি এখন—“আমরা কি ন্যায়বিচারের সমাজ তৈরি করছি, নাকি জনতার রায়ের সমাজ?”

কারণ আদালতের রায় একজন মানুষকে শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু জনতার রায় অনেক সময় একজন মানুষকে রায় ঘোষণার আগেই ধ্বংস করে দিতে পারে। আর যখন কোনো সমাজে অভিযোগ প্রমাণের আগে রায়ে পরিণত হয়, তখন শুধু একজন মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের সম্মিলিত বিশ্বাস।

লেখক : বর্তমানে Bangladesh Army International University of Science & Technology (BAIUST)-এর রেজিস্ট্রার এবং খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি।