বিগত কিছুদিন ধরে জাতীয় গ্রিডে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ তুলনামূলক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাসাবাড়ি, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন এবং শিল্প উৎপাদন খাতে চলমান দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের চাপ বা প্রেসার বৃদ্ধি পাওয়ায় গৃহস্থালির রান্না ও কারখানা পরিচালনায় এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। একই সাথে সিএনজি স্টেশনগুলোতে যানবাহনগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষার সময় আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তবে এই সরবরাহ বৃদ্ধি সত্ত্বেও চাহিদা ও জোগানের মধ্যবর্তী ঘাটতি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
রাজধানীর মিরপুর, আজিমপুর ও শাহবাগসহ একাধিক এলাকা ঘুরে জানা গেছে, যেসব স্থানে ইতিপূর্বে সারাদিন গ্যাস পাওয়া যেত না বা তীব্র সংকট থাকত, সেখানে গত কয়েকদিন ধরে নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বে যেখানে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি নিতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, বর্তমানে এক ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে চালকেরা গ্যাস নিতে পারছেন। ঢাকা শহরের গৃহিণীরা জানান, চরম ভোগান্তির পর এখন স্বস্তিতে দৈনন্দিন রান্নার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
অন্যদিকে শিল্প খাতের মালিকদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন যে, শিল্পকারখানাগুলোতে বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সফল বৈঠকের পর শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ফিরিয়ে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে কার্যকর রূপ নিয়েছে। এর ফলে ওয়াশিং, ডাইং ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের ব্যাহত হওয়া কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এই সংকটের প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত বুঝতে আরও অন্তত তিন মাস সময় লাগবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গত চার দিনে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোবাংলার ১৩-১৪ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী মোট সরবরাহ ছিল ২,৩৪৫.৩ এমএমসিএফডি, যা পর পর বৃদ্ধি পেয়ে ১৬-১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দাঁড়ায় ২,৬০৬.১ এমএমসিএফডিতে। এই চার দিনে সার্বিক সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬০.৮ এমএমসিএফডি বা প্রায় ১১.১ শতাংশ। তবে দৈনিক এই সরবরাহের বড় অগ্রগতি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসেনি; বরং ৯৬ শতাংশ সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে আমদানি করা এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণের (আরএলএনজি) মাধ্যমে। চার দিনের ব্যবধানে আরএলএনজি সরবরাহ ৭৩১.৬ এমএমসিএফডি থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮২.৯ এমএমসিএফডিতে, যা ২৫১.৩ এমএমসিএফডি বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে।
একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল মাত্র ৯.৫ এমএমসিএফডি (১,৬১৩.৭ এমএমসিএফডি থেকে বেড়ে ১,৬২৩.২ এমএমসিএফডি)। দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) উৎপাদন ৪৮২.৪ থেকে ৪৮৪.৭ এমএমসিএফডি এবং বাপেক্সের উৎপাদন ১০০.৩ থেকে ১০৫.৪ এমএমসিএফডি হয়। অন্যদিকে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফএল) উৎপাদন ১৩৯.২ থেকে সামান্য কমে ১৩৯.১ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) উৎপাদন ৮৯১.৭ থেকে বেড়ে ৮৯৪ এমএমসিএফডি হয়েছে। দেশে গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের মোট দৈনিক সক্ষমতা ৩,৮৫৪ এমএমসিএফডি, যার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৬৭.৬ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে।
আমদানিনির্ভর এই সাময়িক স্বস্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবৈতনিক অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম। তাঁর মতে, গ্যাস সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনার ফল। বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় এখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের পর্যাপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিদেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশীয় খনি অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার করা অত্যাবশ্যক। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষম করে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে দেশজ জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব হবে।






















