বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ও এর পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই সংক্রমণ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালে তীব্র শয্যা সংকট ও পরীক্ষার কিটের অভাবে একদিকে যেমন সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে নোংরা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী ও স্বজনেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৯ হাজারেরও বেশি রোগীর মধ্যে ৮ হাজার ৮৭৮ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২৯ জন, যার মধ্যে ২১ জনই শিশু। শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি জানান, পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত ও উদ্বেগজনক। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অন্যদিকে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের লক্ষণ নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে এলেও টেস্ট কিটের মারাত্মক সংকটের কারণে সিংহভাগ রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা জানান, বর্তমানে চমেকের বিশেষায়িত হাম ব্লকে ২৯৬ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জনকে রাখা হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চমেকের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে বর্তমানে ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী ছয়জন বয়স্ক রোগী ভর্তি আছেন। এমনকি আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চমেকে কর্মরত ২৫ বছর বয়সী এক শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) চিকিৎসকও হামে আক্রান্ত হয়েছেন।
সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর। হাসপাতালটিতে বিশেষায়িত হাম ইউনিটে ৫০টি, পিএসইউ ওয়ার্ডে ১০টি এবং আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১৬টিসহ মোট ৭৬টি শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকায় প্রতি শয্যায় দুজন করে শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বহু মা-বাবাকে অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অথবা হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে বিছানা পেতে দিন কাটাতে হচ্ছে। যেমন হালিশহর থেকে আসা শিশু মো. আনিসের মা ফারজানা আক্তার জানান, তাঁর সন্তান তীব্র হামের উপসর্গ নিয়ে চমেকে ২৮ দিন ধরে মেঝেতেই রয়েছে। সাম্প্রতিক তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হামের পাশাপাশি শিশুরা নিউমোনিয়াসহ নানাবিধ জটিলতায় পড়ছে। বেড সংকটের কারণে অনেক হাম রোগীকে সাধারণ ওয়ার্ডেও রাখতে হচ্ছে, যা অন্য শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, “আমরা হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের আলাদাভাবে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় অতিরিক্ত জরুরি প্রস্তুতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। স্থান সংকটের কারণে এক রোগীর কাছ থেকে অন্য রোগীর মাঝে সংক্রমণ ঠেকানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন মেডিকেল অফিসার (এসআইএমও) খাদিজা আহমেদ জানান, ডব্লিউএইচওর গাইডলাইন অনুসারে দেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি (Outbreak) চলছে। চট্টগ্রাম মহানগরের ৯টি ওয়ার্ডকে হামের বিশেষ ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো হলো—২ নম্বর জালালাবাদ, ৪ নম্বর চান্দগাঁও, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী, ১৪ নম্বর লালখান বাজার, ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া, ৩১ নম্বর আলকরণ, ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর এবং ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা। এ ছাড়া জেলার সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও সীতাকুণ্ড উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও চাঁদপুর এলাকাকেও হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫টি উপজেলার তুলনায় চট্টগ্রাম মহানগরীতেই সংক্রমণ বহুগুণ বেশি। মহানগরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮ হাজার ৭১২ জন শিশু, যেখানে ১৫ উপজেলায় এই সংখ্যা ছিল ৩৬৮ জন। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পরীক্ষার জন্য পাঠানো ১৬ হাজার ৯৬০টি শারীরিক নমুনার মধ্যে কিট সংকটের কারণে সিংহভাগ পরীক্ষা করা যায়নি; তবে সম্পন্ন হওয়া পরীক্ষার মধ্যে ৭৪৩ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকা আক্রান্ত শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশেরই বয়স ছিল ৯ মাসের কম, অর্থাৎ হামের প্রথম টিকা দেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৭৫.৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪.৮ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের। আক্রান্তদের ৩১ শতাংশ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। টিকা না নেওয়ার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়া, ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুর অসুস্থতা, ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মায়ের অসুস্থতা, ৪ শতাংশ ভীতি এবং ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলা দায়ী।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। সঠিক সময়ে এমএমআর (MMR) টিকা দেওয়াই এটি প্রতিরোধের প্রধান উপায়। নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়া ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, শিশুদের জ্বরের সঙ্গে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে কোনোভাবেই ঘরে বসে না থেকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আইসোলেশনে রাখা এবং সঠিক সময়ে দুই ডোজ টিকাদান সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।


























