Dhaka ০৪:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

সের মার্বেল থেকে মসজিদে নববীর শীতল মেঝে: মিশরের স্থপতি ড. কামাল ইসমাইল ও এক বিস্ময়কর কাহিনি

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৭:৪৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৫ বার দেখা হয়েছে

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ও সম্মানিত দুটি স্থান—মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর আধুনিক সম্প্রসারণের ইতিহাসের সঙ্গে মিশরীয় প্রখ্যাত স্থপতি ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইলের নাম চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর অনন্য নকশা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও নিপুণ তত্ত্বাবধানে পবিত্র দুই মসজিদের ইতিহাসের বৃহত্তম সম্প্রসারণ কাজসমূহ সম্পাদিত হয়েছিল। আর এই মহান স্থাপত্যকর্মের নেপথ্যে রয়েছে গ্রিসের ‘থাসোস’ দ্বীপের বিশেষ সাদা মার্বেল এবং মসজিদে নববীর শীতল মেঝের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন ঘটনা।

ইসলামিক স্থাপত্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে মক্কার মসজিদুল হারামের বিশাল প্রাঙ্গণে এক বিশেষ ধরনের বিরল সাদা মার্বেল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্রিসের থাসোস দ্বীপের একটি নির্দিষ্ট পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা এই বিশেষ মার্বেল ‘থাসোস মার্বেল’ (Thassos Marble) নামে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এই মার্বেল পাথরের প্রধান ও অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—প্রচণ্ড রোদ ও তীব্র দাবদাহের মধ্যেও এর উপরিভাগ সার্বক্ষণিক তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে। ফলে আরবের প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে খালি পায়ে তাওয়াফ করা লাখ লাখ পুণ্যার্থী ও মসুল্লিদের জন্য এটি অত্যন্ত আরামদায়ক ও সহনীয় পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়। তৎকালীন সময়ে গ্রিসের ওই নির্দিষ্ট পাহাড়টির বড় একটি অংশ কেটে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মার্বেল পাথর সংগ্রহ করা হয় এবং তা মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গণে বসানো হয়।

এর প্রায় এক দশক পর, মক্কার মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণকাজে ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইলের অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফাহদ বিন আবদুল আজিজ তাঁকে মদিনার মসজিদে নববীর বৃহৎ ও ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ প্রকল্পের মূল নকশা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করেন।

মসজিদে নববীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ও মেঝের জন্য ড. ইসমাইল পুনরায় একই গুণসম্পন্ন ‘থাসোস মার্বেল’ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু সেখানে মূল জটিলতা দেখা দেয়—প্রথম দফায় মক্কার মসজিদুল হারামে ব্যবহারের পর এক দশক অতিক্রম হওয়ায় গ্রিসের সেই পাহাড়ে আর উপযুক্ত মার্বেল অবশিষ্ট আছে কি না, তা কারো জানা ছিল না।

মার্বেল সংগ্রহের বাস্তব সম্ভাবনা সরেজমিনে যাচাই করতে স্থপতি ড. ইসমাইল নিজে গ্রিসে যান এবং সংশ্লিষ্ট মার্বেল সরবরাহকারী কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর (সিইও) সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তা তাঁকে চরম হতাশ করে জানান যে, এক দশক আগে প্রথম চালানটি বিক্রির পরপরই পাহাড়ে অবশিষ্ট থাকা সমুদয় মার্বেল অন্য এক আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কিনে নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে তাঁদের কাছে আর কোনো মার্বেল অবশিষ্ট নেই।

এই তথ্য শুনে ড. ইসমাইল অত্যন্ত হতাশ হলেও আশা না ছেড়ে কোম্পানির পুরোনো বিক্রয় নথি ও আর্কাইভ রেকর্ড গভীরভাবে খুঁজে দেখার জন্য তাঁদের বিশেষ অনুরোধ জানান। তিনি ওই সিইও-এর কাছে নিজের তৎকালীন গ্রিক হোটেলের যোগাযোগের ঠিকানা রেখে সেখান থেকে বিদায় নেন।

প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ড. ইসমাইল হোটেলে ফেরার পরদিন সকালেই সেই কাঙ্ক্ষিত ও বিস্ময়কর ফোনকলটি আসে। পুরোনো ধুলোবালি জমে থাকা নথি ঘেঁটে কোম্পানির কর্মকর্তারা সেই ক্রেতার পরিচয় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য ও অলৌকিক বিষয় ছিল—বহু বছর আগে ওই মার্বেলের পুরো চালানটি যিনি কিনেছিলেন, সেই ক্রেতা স্বয়ং সৌদি আরবেরই এক ব্যবসায়ী ছিলেন।

খবরটি পাওয়ামাত্র ড. ইসমাইল দ্রুত সৌদি আরবে ফিরে আসেন এবং সরাসরি ওই সৌদি ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করেন। সেখানে গিয়ে তিনি নিজ চোখে দেখে আরও অভিভূত হন যে, এক দশক আগে গ্রিস থেকে কেনা পুরো মার্বেলের বিশাল মজুতটি এতদিন ধরে ওই ব্যবসায়ীর একটি ব্যক্তিগত গুদামে একদম অব্যবহৃত ও সুরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

ড. ইসমাইল ওই ব্যবসায়ীকে জানান যে, মদিনার মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণ সম্প্রসারণের পবিত্র কাজের জন্য এই মার্বেলগুলো অত্যন্ত জরুরিভাবে প্রয়োজন। তিনি মার্বেলের উপযুক্ত বাজারমূল্য পরিশোধের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন এবং এমনকি যেকোনো পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে একটি খালি চেকও (Blank Cheque) দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই সৌদি ব্যবসায়ী অর্থমূল্য গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।

প্রতীকী সেই মুহূর্তে ব্যবসায়ী আবেগপ্লুত হয়ে জানান, স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলাই হয়তো বহু বছর আগে তাকে দিয়ে ওই নির্দিষ্ট মার্বেলগুলো পারচেজ করিয়েছিলেন এবং এতদিন ধরে গুদামে তা অবিকৃত অবস্থায় ফেলে রাখার পেছনেও হয়তো একটি মহান ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য কাজ করছিল। যখন তিনি নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন যে, এই পাথরগুলো প্রিয় নবী (সা.)-এর মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে ব্যবহৃত হবে, তখন তিনি বিন্দুমাত্র অর্থ না নিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পুরো মার্বেলের মজুত ড. ইসমাইলের হাতে তুলে দেন।

পরবর্তীতে সেই মার্বেল পাথরগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মদিনার মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণের মেঝেতে স্থাপন করা হয়, যা আজও তীব্র তাপদাহের মধ্যেও প্রাঙ্গণকে শীতল রেখে লাখ লাখ পুণ্যার্থীকে স্বস্তি দিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই যে পাথর একসময় গ্রিসের নির্জন পাহাড়ে ছিল, তা পরম করুণাময়ের অদ্ভুত কৌশলে ইসলামের অন্যতম পবিত্রতম স্থান মসজিদে নববীর পবিত্র আঙিনার চিরস্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইলের মহান স্থাপত্যশৈলী এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই সৌদি ব্যবসায়ীর নিঃস্বার্থ ত্যাগের এই ঘটনাটি আজও নিছক কোনো নির্মাণ প্রকল্পের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং দুই পবিত্র মসজিদের খেদমতে এক অবিস্মরণীয় ও অলৌকিক অনুভূতির গল্প হিসেবে বিশ্ব মুসলিমের কাছে শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে স্মরিত হয়।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

সের মার্বেল থেকে মসজিদে নববীর শীতল মেঝে: মিশরের স্থপতি ড. কামাল ইসমাইল ও এক বিস্ময়কর কাহিনি

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৭:৪৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ও সম্মানিত দুটি স্থান—মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর আধুনিক সম্প্রসারণের ইতিহাসের সঙ্গে মিশরীয় প্রখ্যাত স্থপতি ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইলের নাম চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর অনন্য নকশা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও নিপুণ তত্ত্বাবধানে পবিত্র দুই মসজিদের ইতিহাসের বৃহত্তম সম্প্রসারণ কাজসমূহ সম্পাদিত হয়েছিল। আর এই মহান স্থাপত্যকর্মের নেপথ্যে রয়েছে গ্রিসের ‘থাসোস’ দ্বীপের বিশেষ সাদা মার্বেল এবং মসজিদে নববীর শীতল মেঝের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন ঘটনা।

ইসলামিক স্থাপত্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে মক্কার মসজিদুল হারামের বিশাল প্রাঙ্গণে এক বিশেষ ধরনের বিরল সাদা মার্বেল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্রিসের থাসোস দ্বীপের একটি নির্দিষ্ট পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা এই বিশেষ মার্বেল ‘থাসোস মার্বেল’ (Thassos Marble) নামে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এই মার্বেল পাথরের প্রধান ও অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—প্রচণ্ড রোদ ও তীব্র দাবদাহের মধ্যেও এর উপরিভাগ সার্বক্ষণিক তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে। ফলে আরবের প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে খালি পায়ে তাওয়াফ করা লাখ লাখ পুণ্যার্থী ও মসুল্লিদের জন্য এটি অত্যন্ত আরামদায়ক ও সহনীয় পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়। তৎকালীন সময়ে গ্রিসের ওই নির্দিষ্ট পাহাড়টির বড় একটি অংশ কেটে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মার্বেল পাথর সংগ্রহ করা হয় এবং তা মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গণে বসানো হয়।

এর প্রায় এক দশক পর, মক্কার মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণকাজে ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইলের অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফাহদ বিন আবদুল আজিজ তাঁকে মদিনার মসজিদে নববীর বৃহৎ ও ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ প্রকল্পের মূল নকশা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করেন।

মসজিদে নববীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ও মেঝের জন্য ড. ইসমাইল পুনরায় একই গুণসম্পন্ন ‘থাসোস মার্বেল’ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু সেখানে মূল জটিলতা দেখা দেয়—প্রথম দফায় মক্কার মসজিদুল হারামে ব্যবহারের পর এক দশক অতিক্রম হওয়ায় গ্রিসের সেই পাহাড়ে আর উপযুক্ত মার্বেল অবশিষ্ট আছে কি না, তা কারো জানা ছিল না।

মার্বেল সংগ্রহের বাস্তব সম্ভাবনা সরেজমিনে যাচাই করতে স্থপতি ড. ইসমাইল নিজে গ্রিসে যান এবং সংশ্লিষ্ট মার্বেল সরবরাহকারী কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর (সিইও) সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তা তাঁকে চরম হতাশ করে জানান যে, এক দশক আগে প্রথম চালানটি বিক্রির পরপরই পাহাড়ে অবশিষ্ট থাকা সমুদয় মার্বেল অন্য এক আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কিনে নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে তাঁদের কাছে আর কোনো মার্বেল অবশিষ্ট নেই।

এই তথ্য শুনে ড. ইসমাইল অত্যন্ত হতাশ হলেও আশা না ছেড়ে কোম্পানির পুরোনো বিক্রয় নথি ও আর্কাইভ রেকর্ড গভীরভাবে খুঁজে দেখার জন্য তাঁদের বিশেষ অনুরোধ জানান। তিনি ওই সিইও-এর কাছে নিজের তৎকালীন গ্রিক হোটেলের যোগাযোগের ঠিকানা রেখে সেখান থেকে বিদায় নেন।

প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ড. ইসমাইল হোটেলে ফেরার পরদিন সকালেই সেই কাঙ্ক্ষিত ও বিস্ময়কর ফোনকলটি আসে। পুরোনো ধুলোবালি জমে থাকা নথি ঘেঁটে কোম্পানির কর্মকর্তারা সেই ক্রেতার পরিচয় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য ও অলৌকিক বিষয় ছিল—বহু বছর আগে ওই মার্বেলের পুরো চালানটি যিনি কিনেছিলেন, সেই ক্রেতা স্বয়ং সৌদি আরবেরই এক ব্যবসায়ী ছিলেন।

খবরটি পাওয়ামাত্র ড. ইসমাইল দ্রুত সৌদি আরবে ফিরে আসেন এবং সরাসরি ওই সৌদি ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করেন। সেখানে গিয়ে তিনি নিজ চোখে দেখে আরও অভিভূত হন যে, এক দশক আগে গ্রিস থেকে কেনা পুরো মার্বেলের বিশাল মজুতটি এতদিন ধরে ওই ব্যবসায়ীর একটি ব্যক্তিগত গুদামে একদম অব্যবহৃত ও সুরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

ড. ইসমাইল ওই ব্যবসায়ীকে জানান যে, মদিনার মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণ সম্প্রসারণের পবিত্র কাজের জন্য এই মার্বেলগুলো অত্যন্ত জরুরিভাবে প্রয়োজন। তিনি মার্বেলের উপযুক্ত বাজারমূল্য পরিশোধের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন এবং এমনকি যেকোনো পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে একটি খালি চেকও (Blank Cheque) দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই সৌদি ব্যবসায়ী অর্থমূল্য গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।

প্রতীকী সেই মুহূর্তে ব্যবসায়ী আবেগপ্লুত হয়ে জানান, স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলাই হয়তো বহু বছর আগে তাকে দিয়ে ওই নির্দিষ্ট মার্বেলগুলো পারচেজ করিয়েছিলেন এবং এতদিন ধরে গুদামে তা অবিকৃত অবস্থায় ফেলে রাখার পেছনেও হয়তো একটি মহান ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য কাজ করছিল। যখন তিনি নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন যে, এই পাথরগুলো প্রিয় নবী (সা.)-এর মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে ব্যবহৃত হবে, তখন তিনি বিন্দুমাত্র অর্থ না নিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পুরো মার্বেলের মজুত ড. ইসমাইলের হাতে তুলে দেন।

পরবর্তীতে সেই মার্বেল পাথরগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মদিনার মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণের মেঝেতে স্থাপন করা হয়, যা আজও তীব্র তাপদাহের মধ্যেও প্রাঙ্গণকে শীতল রেখে লাখ লাখ পুণ্যার্থীকে স্বস্তি দিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই যে পাথর একসময় গ্রিসের নির্জন পাহাড়ে ছিল, তা পরম করুণাময়ের অদ্ভুত কৌশলে ইসলামের অন্যতম পবিত্রতম স্থান মসজিদে নববীর পবিত্র আঙিনার চিরস্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। ড. মুহাম্মদ কামাল ইসমাইলের মহান স্থাপত্যশৈলী এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই সৌদি ব্যবসায়ীর নিঃস্বার্থ ত্যাগের এই ঘটনাটি আজও নিছক কোনো নির্মাণ প্রকল্পের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং দুই পবিত্র মসজিদের খেদমতে এক অবিস্মরণীয় ও অলৌকিক অনুভূতির গল্প হিসেবে বিশ্ব মুসলিমের কাছে শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে স্মরিত হয়।