একটি কুকুরের কামড় এবং মুহূর্তের অসতর্কতা—ক্ষতস্থান ধোয়া বা চিকিৎসকের কাছে না যাওয়া—কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর ডেকে আনতে পারে জ্বর, অস্থিরতা এবং পানি দেখলে ভয়। তখন অনেক সময় আর কিছু করার থাকে না। জলাতঙ্কের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, উপসর্গ প্রকাশের পর রোগটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। অথচ কামড়ের পর দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, প্রয়োজনীয় টিকা ও চিকিৎসা নিলে এই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘একসঙ্গে আরও শক্তিশালী’ (স্ট্রঙ্গার টুগেদার)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলছে, জলাতঙ্ক নির্মূল সম্ভব, তবে এর জন্য মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। কুকুরের টিকাদান, রোগ নজরদারি, জনসচেতনতা এবং কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা—এই সবগুলোই একই শৃঙ্খলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জলাতঙ্ককে আজ আমরা প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে জানি। তবে মানবসভ্যতার সঙ্গে এ রোগের পরিচয় নতুন নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এ রোগটির লিখিত ও চিত্রভিত্তিক ইতিহাস চার হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতেও উন্মত্ত প্রাণীর আচরণ ও কামড়ের ভয়াবহতার উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রিক পুরাণে লিসা (Lyssa) নামের এক দেবী উন্মাদনা, ক্ষিপ্ততা ও হিংস্র আচরণের প্রতীক। গ্রিক ভাষায় ‘লিসা’ শব্দের অর্থ উন্মাদনা, ক্ষিপ্ততা বা চরম পাগলামি। আধুনিক বিজ্ঞানে জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাস যে লিসাভাইরাস (Lyssavirus) নামে পরিচিত, তার শিকড়ও এই প্রাচীন গ্রিক শব্দেই নিহিত।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অ্যারিস্টটলের লেখাতেও উন্মত্ত কুকুরের কামড়ের বিপদ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ রোগটির কারণ ও প্রতিষেধক সম্পর্কে মানুষ না জানলেও এর লক্ষণ ও পরিণতি বহু আগেই মানুষের নজরে এসেছিল। পরে ১৮৮৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ও তাঁর সহকর্মীদের তৈরি জলাতঙ্কের টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনে। তাঁর প্রয়াণ দিবস ২৮ সেপ্টেম্বর স্মরণে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়।
জলাতঙ্ক ভাইরাস আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে সাধারণত কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানে লালা লাগার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কুকুরই মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রধান উৎস; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৯৯ শতাংশ মানব জলাতঙ্ক সংক্রমণ আক্রান্ত কুকুরের মাধ্যমে ঘটে। বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়, যার ৯৫ শতাংশের বেশি ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকায়।


























