স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) টেকসই, মসৃণ ও অবিনশ্বর উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় পাওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এলডিসি মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিষয়টির চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় এলডিসি জোটের সার্বিক সমর্থন প্রত্যাশা করা হয়।
সম্মেলনের সূচনায় এলডিসি চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী নেপালের সার্বিক নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয় এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গভীর সমবেদনা ও সংহতি প্রকাশ করা হয়। এছাড়া এলডিসি জোটের নতুন চেয়ার রাষ্ট্র হিসেবে দ্য গাম্বিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয় এবং রূপান্তরকালীন দেশগুলোর অগ্রাধিকার সুরক্ষায় অবদানের জন্য জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল (ইউএসজি) রাবাব ফাতেমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নীতির অধীনে বাংলাদেশ এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। সম্মেলনে উত্থাপিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, টেকসই উন্নয়নের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ বর্তমানে ‘৩-আর’ (3R) কৌশল—অর্থাৎ রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনর্বাসন) এবং রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন) নীতি বাস্তবায়ন করছে।
বিশ্বের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দোহা কর্মসূচি গ্রহণের পর থেকে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা, অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) বা সরকারি উন্নয়ন সহায়তা হ্রাস এবং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট চরম রূপ ধারণ করেছে। এসব প্রতিকূলতার কারণে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত ৭ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার নিচে অবস্থান করছে; যা ২০২৬ সালে ৪.৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, খাদ্য মজুত ব্যবস্থা জোরদার, টেকসই গ্র্যাজুয়েশন সাপোর্ট ফ্যাসিলিটি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সহায়তা কেন্দ্র এবং দুর্যোগ সহনশীলতা গড়ার ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
এলডিসি কর্মসূচির মধ্যবর্তী পর্যালোচনার (Mid-Term Review) উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৬টি প্রধান অগ্রাধিকার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়:
১. অর্থায়ন সংকট দূরীকরণ: ওডিএ হ্রাস রোধ করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সহজ শর্তে বৈশ্বিক ঋণ ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন প্রসার এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
২. বাণিজ্য সম্প্রসারণ: শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা প্রসারিত করা, উৎসবিধির (Rules of Origin) জটিলতা দূর করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্য সহজীকরণ জোরদার করা।
৩. জলবায়ু অর্থায়ন: জলবায়ু অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতি পূরণের (Loss and Damage) লক্ষ্যে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ও সহজলভ্য বৈশ্বিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
৪. পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধার: অবৈধ অর্থ পাচার রোধ করা এবং বিদেশ পাচার হওয়া জাতীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা শক্তিশালী করা।
৫. উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর: শিল্পায়ন, কৃষিপণ্যের মূল্যসংযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা।
৬. জাতিসংঘের সংস্কার: ‘ইউএন৮০’ (UN80) উদ্যোগ ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এলডিসিগুলোর জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো বৈশ্বিক পরিকাঠামো তৈরি করা।
সম্মেলনের সমাপনীতে আশা প্রকাশ করা হয়, সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীতব্য ‘এলডিসি মন্ত্রীপর্যায়ের ঘোষণা’ সদস্য দেশগুলোর বিদ্যমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।


























