Dhaka ০২:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

পোশাক খাতের শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রমাণ মিলল

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:৪৩:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে

রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ ও ন্যায্য মজুরি আদায়ের চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং দেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে তৎপর হয়ে উঠেছে একটি চক্র। শ্রমিকদের এই ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সরকার কর্তৃক ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা রাজনৈতিক দল ‘আওয়ামী লীগ’ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী সুপরিকল্পিতভাবে এই আন্দোলনে সরাসরি অনুপ্রবেশ করে সুদূরপ্রসারী নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে বলে জোরালো প্রমাণ মিলেছে।

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের প্রাথমিক জবানবন্দি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন ভিডিও ক্লিপসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই নাশকতার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের উসকানিমূলক গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

ফ্যাক্টচেকের জালে নাশকতার স্বীকারোক্তি ও অপপ্রচার: প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) অধীনস্থ নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম ‘বাংলাফ্যাক্ট’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, हालেই পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার অপরাধ স্বীকার করে ফেসবুকে সরাসরি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামক একটি দলীয় গ্রুপ থেকে এই উসকানিমূলক স্বীকারোক্তি প্রকাশ করা হয়।

বাংলাফ্যাক্টের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর ‘ঙ’হবরষষ জধুরন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামক ওই অনলাইন গ্রুপে গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার দায় স্বীকার করে দুটি পৃথক পোস্ট করা হয়। পরবর্তীতে নিবিড় তদন্ত চালিয়ে ফ্যাক্টচেক টিম নিশ্চিত হয় যে, ওই আইডি ব্যবহারকারী ব্যক্তির আসল নাম রাজীব চন্দ্র দাস। অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর নাশকতার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে প্রকাশ্যে পোস্ট দেওয়ায় পুলিশ ইতিমধ্যেই রাজীব চন্দ্র দাস নামের ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

এর পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভুয়া ভিডিও তৈরি করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও ধরা পড়েছে। ‘ঢাকাতে শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে’—এমন সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা সৃষ্টির যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছিল, তা-ও সফলভাবে শনাক্ত ও উন্মোচন করেছে পিআইবির বাংলাফ্যাক্ট টিম।

পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ও ৩৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার: পোশাক শ্রমিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সুপরিকল্পিতভাবে নাশকতা ও সহিংসতা সৃষ্টির অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মোট ৩৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত ২৪ ঘণ্টার বিশেষ ঝটিকা অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, যাঁরা সবাই মূলত নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মূল মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের জোরালো দাবিতে আকস্মিক সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। ওই কর্মসূচি চলাকালীন পরিস্থিতি হঠাৎ অত্যন্ত সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভের একপর্যায়ে সেখানে নিয়োজিত পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, একাধিক ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয় এবং সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই দিনই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকে প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনরত সাধারণ শ্রমিকদের ভিড়ে সুকৌশলে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা ও অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগে প্রাথমিকভাবে ১১ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত এই ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধা সহ দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলা থেকে বিশেষভাবে ঢাকায় এসে নাশকতার মিশনে যোগ দিয়েছিল।

তদন্তে আরও জানা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লার সরাসরি প্রত্যক্ষ মদদে ও নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্থের বিনিময়ে শতাধিক লোক সংগ্রহ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ কিছু অনলাইন মেসেজিং ও সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপের মাধ্যমে অত্যন্ত সুসংগঠিত হয়ে এই নাশকতার পুরো পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে গোয়েন্দা বিভাগ।

নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও নির্দিষ্ট স্থানে পাঠানোর পর তার প্রমাণস্বরূপ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নাশকতাকারীদের হাতে মোটা অঙ্কের টাকা পৌঁছে দেওয়ার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ও তথ্য পাওয়ার কথাও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি সন্দেহজনক অনলাইন গোপন গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ছবি, ভিডিও এবং নিজেদের সঠিক অবস্থানের লাইভ তথ্য আদান-প্রদান করা হতো। এমনকি বেশ কয়েকজন আসামির মোবাইল ফোন থেকেই ঘটনাস্থলে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের বাস্তব ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে।

সরকার ও দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের কড়া হুঁশিয়ারি: উদ্ভূত এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, সরকার বর্তমান পোশাকশিল্পের মেহনতি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে এবং তাদের নায্য অধিকার রক্ষা করতে সর্বান্তকরণে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী তাদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকার ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ কার্যকর একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং ওই বোর্ডের দাপ্তরিক কার্যক্রমও পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় রাজপথে নতুন করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আর বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ বা যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মহল বা কুচক্রী গোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের নানাভাবে ভুল বুঝিয়ে বা উসকে দিয়ে দেশের শিল্পখাতকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টা চালায়, তবে সেই অপতৎপরতা অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম হাতে দমন করা হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নায্য ও যৌক্তিক জীবনমুখী দাবির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এসব অপরাধমূলক কাজের সম্পূর্ণ পেছনেই গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও গোপন অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েছে।

একই সুরে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয় এবং বর্তমান চড়া মূল্যস্ফীতির বাস্তব বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও চলমান এই আন্দোলনের আড়ালে যেসব সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, তার পেছনে মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের লুটপাট করে জমানো বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের গভীর সংযোগ থাকতে পারে।”

উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, শ্রমিকদের প্রতিটি ন্যায্য দাবির প্রতি পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখেই সরকার নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এই বিশেষ বোর্ড গঠন করেছে। ফলে বর্তমানে শ্রমিকদের মূল আন্দোলন বা দাবি আদায়ের জন্য আলাদা করে কোনো ধরনের সহিংসতার যৌক্তিকতা থাকার কথা নয়। এর মধ্যেও যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙচুর ও সহিংস আচরণ করে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে দেশের কোনো সাধারণ ও সৎ শ্রমিকের ন্যূনতম সম্পৃক্ততা থাকতে পারে না।

শ্রমিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও ঐকমত্য: এদিকে সরকার কর্তৃক পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য দ্রুততম সময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করার এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে অত্যন্ত সাধুবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “সরকার ইতিমধ্যে শ্রমিকদের স্বার্থে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। অথচ এর পরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ শ্রমিকদের নিরীহ নাম ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে আন্দোলন ও নাশকতার ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের কোনো প্রকৃত ও সাধারণ শ্রমিকদের ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই; বরং এগুলো সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হীন উদ্দেশ্যে পরিচালিত সুপরিকল্পিত নাশকতামূলক আন্দোলন।” তিনি অবিলম্বে শিল্প-কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি কুচক্রীকে কঠোরভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জোরালো দাবি জানান।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির প্রধান সমন্বয়ক তাসলিমা আখতার মনে করেন, দেশের চলমান শ্রম আইনে দীর্ঘদিনের পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর নিয়মিত মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান যুক্ত হওয়াটি দেশের সমগ্র শ্রমিক সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক অগ্রগতি। দেশের বর্তমান বাজারদর এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের নায্য মজুরি নির্ধারণের জন্য এই আইনি পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “কোনো অবস্থাতেই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না, কারণ তাতে শ্রমিক এবং মালিক—উভয় পক্ষই চরম দুর্ভোগের শিকার হন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিটি পুরোপুরি যৌক্তিক। তবে এই যৌক্তিক দাবিকে কোনো কুচক্রী মহল যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দেশে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”

বাংলাদেশ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কুতুবউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ আলোচনা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর শ্রম আইনে ঐতিহাসিক সংশোধন এনে তিন বছর পর পর মজুরি বোর্ড গঠনের যে আইনি বিধান করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করবে। তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বেই পোশাক শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ২৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করার সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন বর্তমান বোর্ড গঠনকে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে বলেন, “এখন এই নবগঠিত বোর্ডের সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছুটা উপযুক্ত সময় দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আসা নানা ধরনের দাবিগুলো একে অপরের সঙ্গে যথাযথভাবে সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তৈরি করা দরকার। অতীতে যেমন দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো, এবার যেন সেই দীর্ঘ সময় না নিয়ে ঘন ঘন বৈঠকের মাধ্যমে অতি দ্রুত নতুন মজুরি চূড়ান্ত করা হয়।” তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, বোর্ড গঠনের সুসংবাদের পর রাস্তাঘাটে যেকোনো ধরনের আন্দোলন, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য হতে পারে না। কারখানাসমূহে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমের সুযোগ ও পরিধি আরও বাড়ানো হলে শ্রমিকদের ভেতর সচেতনতা বৃদ্ধি পেত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো।

পরিশেষে দেশের সকল বিশিষ্ট শ্রমিক নেতৃবৃন্দের একটাই সুস্পষ্ট অভিমত—নতুন এই নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমেই বর্তমানে শ্রমিকদের সমস্ত নায্য দাবিগুলো অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে যথাযথভাবে উপস্থাপন ও দ্রুত নিষ্পত্তির স্থায়ী সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে অযৌক্তিক সংঘাত ও ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে একমাত্র গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই অতি দ্রুত শ্রমিকদের নতুন মজুরি চূড়ান্ত করা এবং দেশের প্রতিটি শিল্প-কারখানার ভেতরে পুরোপুরি স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তে সকলের একমাত্র মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

পোশাক খাতের শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রমাণ মিলল

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:৪৩:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ ও ন্যায্য মজুরি আদায়ের চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং দেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে তৎপর হয়ে উঠেছে একটি চক্র। শ্রমিকদের এই ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সরকার কর্তৃক ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা রাজনৈতিক দল ‘আওয়ামী লীগ’ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী সুপরিকল্পিতভাবে এই আন্দোলনে সরাসরি অনুপ্রবেশ করে সুদূরপ্রসারী নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে বলে জোরালো প্রমাণ মিলেছে।

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের প্রাথমিক জবানবন্দি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন ভিডিও ক্লিপসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই নাশকতার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের উসকানিমূলক গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

ফ্যাক্টচেকের জালে নাশকতার স্বীকারোক্তি ও অপপ্রচার: প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) অধীনস্থ নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম ‘বাংলাফ্যাক্ট’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, हालেই পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার অপরাধ স্বীকার করে ফেসবুকে সরাসরি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামক একটি দলীয় গ্রুপ থেকে এই উসকানিমূলক স্বীকারোক্তি প্রকাশ করা হয়।

বাংলাফ্যাক্টের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর ‘ঙ’হবরষষ জধুরন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামক ওই অনলাইন গ্রুপে গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার দায় স্বীকার করে দুটি পৃথক পোস্ট করা হয়। পরবর্তীতে নিবিড় তদন্ত চালিয়ে ফ্যাক্টচেক টিম নিশ্চিত হয় যে, ওই আইডি ব্যবহারকারী ব্যক্তির আসল নাম রাজীব চন্দ্র দাস। অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর নাশকতার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে প্রকাশ্যে পোস্ট দেওয়ায় পুলিশ ইতিমধ্যেই রাজীব চন্দ্র দাস নামের ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

এর পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভুয়া ভিডিও তৈরি করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও ধরা পড়েছে। ‘ঢাকাতে শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে’—এমন সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উত্তেজনা সৃষ্টির যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছিল, তা-ও সফলভাবে শনাক্ত ও উন্মোচন করেছে পিআইবির বাংলাফ্যাক্ট টিম।

পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ও ৩৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার: পোশাক শ্রমিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সুপরিকল্পিতভাবে নাশকতা ও সহিংসতা সৃষ্টির অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের মোট ৩৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত ২৪ ঘণ্টার বিশেষ ঝটিকা অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, যাঁরা সবাই মূলত নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মূল মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের জোরালো দাবিতে আকস্মিক সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। ওই কর্মসূচি চলাকালীন পরিস্থিতি হঠাৎ অত্যন্ত সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভের একপর্যায়ে সেখানে নিয়োজিত পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, একাধিক ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয় এবং সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই দিনই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকে প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনরত সাধারণ শ্রমিকদের ভিড়ে সুকৌশলে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা ও অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগে প্রাথমিকভাবে ১১ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত এই ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধা সহ দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলা থেকে বিশেষভাবে ঢাকায় এসে নাশকতার মিশনে যোগ দিয়েছিল।

তদন্তে আরও জানা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লার সরাসরি প্রত্যক্ষ মদদে ও নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্থের বিনিময়ে শতাধিক লোক সংগ্রহ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ কিছু অনলাইন মেসেজিং ও সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপের মাধ্যমে অত্যন্ত সুসংগঠিত হয়ে এই নাশকতার পুরো পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে গোয়েন্দা বিভাগ।

নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও নির্দিষ্ট স্থানে পাঠানোর পর তার প্রমাণস্বরূপ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নাশকতাকারীদের হাতে মোটা অঙ্কের টাকা পৌঁছে দেওয়ার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ও তথ্য পাওয়ার কথাও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি সন্দেহজনক অনলাইন গোপন গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ছবি, ভিডিও এবং নিজেদের সঠিক অবস্থানের লাইভ তথ্য আদান-প্রদান করা হতো। এমনকি বেশ কয়েকজন আসামির মোবাইল ফোন থেকেই ঘটনাস্থলে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের বাস্তব ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে।

সরকার ও দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের কড়া হুঁশিয়ারি: উদ্ভূত এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, সরকার বর্তমান পোশাকশিল্পের মেহনতি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে এবং তাদের নায্য অধিকার রক্ষা করতে সর্বান্তকরণে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী তাদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকার ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ কার্যকর একটি নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং ওই বোর্ডের দাপ্তরিক কার্যক্রমও পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় রাজপথে নতুন করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আর বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ বা যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মহল বা কুচক্রী গোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের নানাভাবে ভুল বুঝিয়ে বা উসকে দিয়ে দেশের শিল্পখাতকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টা চালায়, তবে সেই অপতৎপরতা অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম হাতে দমন করা হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নায্য ও যৌক্তিক জীবনমুখী দাবির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এসব অপরাধমূলক কাজের সম্পূর্ণ পেছনেই গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও গোপন অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েছে।

একই সুরে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয় এবং বর্তমান চড়া মূল্যস্ফীতির বাস্তব বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও চলমান এই আন্দোলনের আড়ালে যেসব সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, তার পেছনে মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের লুটপাট করে জমানো বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের গভীর সংযোগ থাকতে পারে।”

উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, শ্রমিকদের প্রতিটি ন্যায্য দাবির প্রতি পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখেই সরকার নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এই বিশেষ বোর্ড গঠন করেছে। ফলে বর্তমানে শ্রমিকদের মূল আন্দোলন বা দাবি আদায়ের জন্য আলাদা করে কোনো ধরনের সহিংসতার যৌক্তিকতা থাকার কথা নয়। এর মধ্যেও যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙচুর ও সহিংস আচরণ করে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে দেশের কোনো সাধারণ ও সৎ শ্রমিকের ন্যূনতম সম্পৃক্ততা থাকতে পারে না।

শ্রমিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও ঐকমত্য: এদিকে সরকার কর্তৃক পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য দ্রুততম সময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করার এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে অত্যন্ত সাধুবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “সরকার ইতিমধ্যে শ্রমিকদের স্বার্থে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। অথচ এর পরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ শ্রমিকদের নিরীহ নাম ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে আন্দোলন ও নাশকতার ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের কোনো প্রকৃত ও সাধারণ শ্রমিকদের ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই; বরং এগুলো সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হীন উদ্দেশ্যে পরিচালিত সুপরিকল্পিত নাশকতামূলক আন্দোলন।” তিনি অবিলম্বে শিল্প-কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকটি কুচক্রীকে কঠোরভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জোরালো দাবি জানান।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির প্রধান সমন্বয়ক তাসলিমা আখতার মনে করেন, দেশের চলমান শ্রম আইনে দীর্ঘদিনের পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর নিয়মিত মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান যুক্ত হওয়াটি দেশের সমগ্র শ্রমিক সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক অগ্রগতি। দেশের বর্তমান বাজারদর এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের নায্য মজুরি নির্ধারণের জন্য এই আইনি পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “কোনো অবস্থাতেই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না, কারণ তাতে শ্রমিক এবং মালিক—উভয় পক্ষই চরম দুর্ভোগের শিকার হন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিটি পুরোপুরি যৌক্তিক। তবে এই যৌক্তিক দাবিকে কোনো কুচক্রী মহল যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দেশে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”

বাংলাদেশ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কুতুবউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ আলোচনা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর শ্রম আইনে ঐতিহাসিক সংশোধন এনে তিন বছর পর পর মজুরি বোর্ড গঠনের যে আইনি বিধান করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করবে। তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বেই পোশাক শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ২৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করার সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন বর্তমান বোর্ড গঠনকে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে বলেন, “এখন এই নবগঠিত বোর্ডের সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছুটা উপযুক্ত সময় দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আসা নানা ধরনের দাবিগুলো একে অপরের সঙ্গে যথাযথভাবে সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তৈরি করা দরকার। অতীতে যেমন দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো, এবার যেন সেই দীর্ঘ সময় না নিয়ে ঘন ঘন বৈঠকের মাধ্যমে অতি দ্রুত নতুন মজুরি চূড়ান্ত করা হয়।” তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, বোর্ড গঠনের সুসংবাদের পর রাস্তাঘাটে যেকোনো ধরনের আন্দোলন, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য হতে পারে না। কারখানাসমূহে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমের সুযোগ ও পরিধি আরও বাড়ানো হলে শ্রমিকদের ভেতর সচেতনতা বৃদ্ধি পেত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো।

পরিশেষে দেশের সকল বিশিষ্ট শ্রমিক নেতৃবৃন্দের একটাই সুস্পষ্ট অভিমত—নতুন এই নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমেই বর্তমানে শ্রমিকদের সমস্ত নায্য দাবিগুলো অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে যথাযথভাবে উপস্থাপন ও দ্রুত নিষ্পত্তির স্থায়ী সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে অযৌক্তিক সংঘাত ও ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে একমাত্র গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই অতি দ্রুত শ্রমিকদের নতুন মজুরি চূড়ান্ত করা এবং দেশের প্রতিটি শিল্প-কারখানার ভেতরে পুরোপুরি স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তে সকলের একমাত্র মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।