আজ সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে দেশের মোট ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাপকভাবে চলাচলরত ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ই-রিকশার আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকা এসব যানবাহনকে সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। পরবর্তীতে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গতকাল রোববার (১ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় ধীরগতির ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান (ই-রিকশা) চলাচল-সংক্রান্ত নতুন বিধিমালা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি জানান, বহুবছর ধরে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ছাড়া চলাচল করা ই-রিকশাগুলোকে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় এনে আইনি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯’ সংশোধনের মাধ্যমে ই-রিকশা নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি ও কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, উক্ত আইনের ১২০ ধারায় এ-সংক্রান্ত প্র প্রয়োজনীয় বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে। বিধিমালা প্রণয়নের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনি যাচাই শেষ করে তা ইতোমধ্যেই সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে আজ থেকে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করতে প্রশাসনিক বা আইনি আর কোনো বাধা অবশিষ্ট নেই।
নিবন্ধন ও নবায়ন ফি-সংক্রান্ত তথ্য: ঘোষিত নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ই-রিকশার প্রারম্ভিক নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। কারিগরি ফিটনেস পরীক্ষা শেষে এক বছর পর উক্ত যান নবায়ন করতে ফি দিতে হবে ৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার জন্য প্রাথমিক নিবন্ধন ফি ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা এবং এক বছর পর তার নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা।
বিধিমালার শর্তানুযায়ী, একটি নিবন্ধিত ই-রিকশা সড়কপথে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত চলাচল করতে পারবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন কর্তৃক সরবরাহকৃত বিশেষ কিউআর (QR) কোডযুক্ত ফিটনেস সনদ প্রদর্শনের সুবিধার জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা ফি প্রদান করতে হবে।
উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ কমিটি: ই-রিকশা তৈরি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে তদারকি করা এবং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের সুপারিশ করার লক্ষ্যে সরকার সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), সিটি করপোরেশন, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম উল্লেখ করেন, বুয়েটের অনুমোদিত নির্দিষ্ট নকশা ও কাঠামো অনুযায়ী ই-রিকশা তৈরি করতে হবে। বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলোকেও বুয়েট অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সংস্কার করতে হবে। বুয়েটের অনুমোদিত মডেল অনুসরণ করে এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের পূর্বানুমতি নিয়ে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যানবাহনে এসব পরিবর্তন আনবে।
এছাড়া বিধিমালায় ই-রিকশার পুরনো ব্যাটারি উন্মুক্ত স্থানে ভাঙা বা গলানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
আইন লঙ্ঘন ও নির্ধারিত অপরাধসমূহ: নতুন বিধিমালায় ই-রিকশা পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কাজকে সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিবন্ধন ব্যতীত ই-রিকশা চালানো, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা, অনুমোদনহীন অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার এবং মোটর বা গাড়ির মূল কাঠামোর অননুমোদিত পরিবর্তন সাধন করা।
একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ও মূল সড়কে চলাচল করা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, যাত্রী ব্যতীত শুধু ভারী মালামাল পরিবহন, ট্রাফিক সংকেত অমান্য করা এবং দুর্ঘটনা ঘটানোর পর গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়াকেও আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে মন্ত্রী সতর্ক করেন।
ঢাকায় আটটি জোন করার পরিকল্পনা: এদিকে রাজধানী ঢাকায় ই-রিকশার শৃঙ্খলা ফেরাতে পুরো শহরকে মোট আটটি জোনে ভাগ করে চলাচলের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ—দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতে চারটি করে জোন থাকবে।
প্রতিটি নির্দিষ্ট জোনের ই-রিকশার গায়ের রং হবে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনের ভৌগোলিক সীমানায় ঢুকতে বা চলাচল করতে পারবে না।
রাজধানীর তীব্র যানজটের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি নির্দিষ্ট জোনে সর্বাধিক কতটি ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি পাবে, তা ট্রাফিক পুলিশ এবং দুই সিটি করপোরেশন যৌথ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। তবে ই-রিকশার সর্বমোট সংখ্যার ওপর এখনও চূড়ান্ত কোনো সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি।
নিবন্ধনের পর চালকদের লাইসেন্স প্রদান: প্রণীত বিধিমালায় চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান থাকলেও সরকার এখনই সেই প্রক্রিয়া চালু করছে না। প্রতিমন্ত্রী জানান, একযোগে বিপুলসংখ্যক ড্রাইভারের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করা সিটি করপোরেশনগুলোর জন্য প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রথম ধাপে যানবাহনের লাইসেন্স ও নিবন্ধন সম্পন্ন করার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরবর্তীতে আলাদা সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চালকদেরও লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
অবৈধ উচ্ছেদ নয়, পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা: রাজধানীতে বর্তমানে কর্মরত ই-রিকশাচালকদের অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। সরকার হঠাৎ করেই তাদের জীবিকা বা চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সবাইকে আপাতত যেভাবে যান চলাচল করছে, সেভাবেই চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম মেনে পর্যায়ক্রমে সব যানবাহন নিবন্ধন করা হবে এবং ধাপে ধাপে অননুমোদিত ও অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিবন্ধন কার্যক্রমের গতি প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া জারি থাকবে বলে তিনি জানান।
সৌরবিদ্যুৎচালিত আধুনিক চার্জিং পয়েন্ট: সড়কের ই-রিকশা চার্জিং স্টেশন নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও নতুন বিধিমালায় আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত অনুমোদিত স্থানে চার্জিং পয়েন্ট স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের (সোলার) মাধ্যমে ই-রিকশা চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, তারা সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বা চোরাই লাইন ব্যবহার করে ই-রিকশা চার্জ দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত অভিযান ও তদারকি পরিচালনা করবেন।
কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ: সমগ্র দেশে ই-রিকশার সার্বিক নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর যাত্রীভাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। যানবাহনের মালিক সমিতি, ট্রাফিক বিভাগ এবং সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করে কিলোমিটারপ্রতি যুক্তিযুক্ত ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।






















